ইতিহাসের সাক্ষী চট্টগ্রামের একমাত্র রেলওয়ে জাদুঘর

ফয়সাল উদ্দীন নীরব : রেল ভ্রমণ পছন্দ করেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য অনেকেই রেল ভ্রমণকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।

ব্রিটিশ আমল থেকে আজ পর্যন্ত বাংলদেশ রেলওয়ের ইতিহাস ব্যাপক বিস্তৃত। দিন যত এগুচ্ছে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগছে রেলওয়ের ব্যবস্থাপনায়। কালের বির্বতনে রেলের স্টিম ইঞ্জিন এখন আর বগি নিয়ে দৌড়ায় না। 
রেলওয়ে জাদুঘর - ছবি : ফয়সাল উদ্দিন নীরব 


১৮৬২ সাল হতে শুরু করা বাংলাদেশ রেলওয়ে আজ পেরিয়ে এসেছে দেড়শ’বছর। এর মধ্যে হয়েছে অনেক পরিবর্তন, রেলওয়ে প্রত্যক্ষ করেছে অনেক পালাবদল। দীর্ঘ এই পথচলায় রেলওয়ের অনেক যন্ত্রাংশ আর আগের মতো নেই। থাকার কথাও না। অনেক পরিবর্তন হয়েছে যন্ত্রপাতির। পরিবর্তনের ছোয়ার ফলে পুরোনো যন্ত্রাংশকে বাতিল বলে গণ্য করতে হয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে। আর এসব বাতিল হওয়া যন্ত্রাংশগুলোর ঠাঁই হয় দেশের একমাত্র রেলওয়ে জাদুঘরে।

জাদুঘরটির অবস্থান বন্দর নগরী চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ওয়ার্ডে। ২০০৩ সালের ৫ নভেম্বর তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী এর উদ্বোধন করেন। জাদুঘরের সম্পূর্ণ সীমানা ১২০০ একরের। জাদুঘরটি প্রায় ৪২০০ বর্গফুট এবং কাঠের তৈরি দোতলা। জাদুঘরটি দেখতে গেলে এর চারপাশের পরিবেশ আপনাকে মুগ্ধ করবে। তবে হয়তো হতাশ হতে হবে বাংলাদেশ রেলওয়ের এই একমাত্র জাদুঘরটির অবস্থা দেখে। মরচে পড়া টিন ও জরাজীর্ণ অবস্থা দেখে বুঝা যায় বার্ধক্যের ভারে ঝিমুচ্ছে জাদুঘরটি। আর হয়তো কিছুদিন পর টিন, কাঠগুলো খসে খসে পড়বে। জাদুঘরটির ঠিক পাশেই রয়েছে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী প্রীতিলতার স্মৃতি ধারণকারী ইউরোপিয়ান ক্লাব।

জাদুঘরটিতে প্রবেশ করলেই আপনি দেখতে পাবেন রেলওয়ের যন্ত্রপাতির চার ভাগে রাখা আছে। বামদিকের গ্যালারিতে রয়েছে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে, ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে, ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ে ও বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন মনোগ্রাম।
      
রেলওয়ে জাদুঘর - ছবি : ফয়সাল উদ্দিন নীরব

এছাড়া দেখতে পাবেন ডায়নামো, লোকোমোটিভ সেফটি ডিভাইস, ডেডম্যান, অ্যালার্ম বেল স্পিডোমিটার, বিভিন্ন ধরনের লাইট যেমন ঝাড়বাতি, রিনিং ল্যাম্প, গেইট ল্যাম্প, টেইল ল্যাম্প ইত্যাদি। রয়েছে রেলওয়ের গার্ডদের ব্যবহার্য যন্ত্রপাতি, ক্যাপ, ডেটিং মেশিন, পিতলের ব্যাজ, গার্ডবোট, হ্যামার সহ অনেক কিছু।

সংকেত বিভাগে সংরক্ষিত যন্ত্রপাতিগুলোর মধ্যে দেখতে পাবেন পয়েন্ট টাইমিং মেশিন, মোর্স কি উইথ, সাউন্ডার, আর্ক লিভার, কন্ট্রোল কি, সিগনাল আর্ম, টুলবক্স, অ্যানালগ টেলিফোন, রোডল টেলিফোন, রেডিও ট্রান্সমিটার, রিসিভার ইত্যাদি।

প্রকৌশল ও ট্রাফিক বিভাগে দেখতে পাবেন ভেনসোমিটার, থার্মোমিটার, মেজারিং ক্যান, স্প্যানার সিঙ্গেল, অ্যাডেড বারটমি, মনোরেল হুইল বোরো প্যাকিং লেভেল ইত্যাদি।

শত বছরের ইতিহাস বহনকারী রেলওয়ের একমাত্র জাদুঘরটির নাজুক কাঠামোর ব্যাপারে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক জামাল উদ্দীন জানান, ‘রেলওয়ের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ গত কয়েক দিন আগে ঘুরে গেছেন, শিগগির সংস্কার কাজ শুরু হবে।’

রেলওয়ে জাদুঘরটি শুক্রবার বন্ধ থাকে। দর্শনার্থীদের জন্য শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার খোলা থাকে, সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। বন্দর নগরী চট্টগ্রামে যারাই ভ্রমণ করতে যান রেলওয়ের ইতিহাস বিজড়িত এই জাদুঘরটি দেখে আসতে ভুলবেন না।

বঙ্গবন্ধুর ২৫ মার্চ রাতের বার্তা: চট্টগ্রাম কিভাবে পেয়েছিল!



মঈনুল আলম : ১৯৭১এর ২৫ মার্চের রাতে চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জে ইত্তেফাকের অফিস-কাম-আমার আবাসিক ফ্ল্যাটে কি অস্থিরতায় রাত কাটাচ্ছি! আমার দুটি টেলিফোন অনবরত বেজে উঠছে। সকলেই জানতে চাচ্ছে, ঢাকায় কি হচ্ছে?
আমি জবাব দিতে পারছিনা, কারণ রাত ১১টার পর হতে ঢাকার সাথে এবং বাইরের দুনিয়ার সাথে চট্টগ্রামের সব টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

আমি ও আমার স্ত্রী নার্গিস ড্রয়িং রুমের ডিভানে পাশাপাশি শুয়েছি বিপরীত মেরু করে, অর্থাৎ আমার মাথার পাশে তার পা, আর তার পায়ের পাশে আমার মাথা। দু’ জনের কানের পাশে দুটি টেলিফোন রেখেছি। টেলিফোন দুটি বারবার বেজে উঠছে। দু’ জনেই জওয়াব দিচ্ছি। কিন্তু একজনের কথা বলা আরেক জনের কথা বলাতে শোনা যাচ্ছে না। এ ভাবেই চোখে একটু তন্দ্রা এসে গিয়েছিলো। হঠাৎ শুনলাম দূরে অবিরাম মেসিনগানের গুলিবর্ষণের টা টা টা শব্দ। মনে হলো নতুনপাড়া ক্যান্টনমেন্টের দিক হতে আসছে গোলাগুলির শব্দ!

এ ভাবে আধো তন্দ্রা আধো জাগরণে রাত কাটলো। ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখি ভোর ৬টা। কোথা হতে সংবাদ জোগাড় করি? মনে পড়লো (সীতাকু- ও মীরসরাই-এর কাছাকাছি) ছলিমপুর ওয়ারলেস স্টেশনের কথা। ঢাকার সাথে চট্টগ্রামের টেলি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও ওদের হয়ত যোগাযোগ থাকতে পারে। বড় বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগে যখন ঢাকার সাথে চট্টগ্রামের সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে অনেক সময় ছলিমপুর ওয়ারলেস স্টেশন হতে সাহায্য পেয়েছি।

এখন ভোর সাড়ে ছয়টা। আমি ফোন করতেই সাড়া দিলেন স্টেশনে ডিউটিরত সহকারী প্রকৌশলী গোলাম রব্বানী ডাকুয়া। তিনি বেশ উত্তেজিত। বললেন, কাল রাতে ঢাকার সাথে টেলি-যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে শেখ সাহেবের কাছ হতে একটা মেসেজ এসেছে। এটা জানানোর জন্য চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের ফোনে কাউকে তিনি পাচ্ছেন না।

আমি সাগ্রহে বললাম, বার্তাটি পড়েন, আমি লিখে নিচ্ছি।
বার্তাটি ইংরেজিতে। গোলাম রব্বানী পড়লেন, আমি লিখে নিলাম: "Message to the people of Bangladesh and the people of the world. Rajarbagh police camp and Peelkhana EPR suddenly attacked by Pak Army at 2400 hours. Thousands of people killed. Fierce fighting going on. Appeal to the world for help in freedom struggle. Resist by all means. May Allah be with you. Joy Bangla.! Message from Sheikh Mujibur Rahman "

আমার শরীরের ভিতর দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহ খেলে গেল। কাল রাত হতে যে চরম অস্থিরতায় সময় কাটছিলো এক মুহূর্তে তা কেটে গেল। এখন কি ঘটছে আমি তার একটা ধারণা করতে পারছি। আমার কি কর্তব্য সে সম্পর্কেও আমি একটা পথরেখা দেখতে পাচ্ছি। ডাকুয়াকে বললাম, আমি এখনই এ বার্তা যথাস্থানে পৌঁছে দিচ্ছি। আমার ফোন নম্বর দুটি দিয়ে অনুরোধ করলাম, আর কোন খবর পেলে যেন সাথে সাথেই আমাকে জানান।

বার্তাটি কয়েকবার পড়লাম। আমার মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না যে বার্তাটি বঙ্গবন্ধুর কাছ হতে এসেছে। বিশেষ করে বার্তাটির শব্দ প্রয়োগের ধাঁচে আমাদের পরিচিত বঙ্গবন্ধুকে দেখতে পাচ্ছিলাম। “লাখ লাখ মানুষ মরছে”, “তোমাদের সর্ব শক্তি দিয়ে প্রতিরোধ কর”, “আল্লাহ তোমাদের সহায় হউন”। এ সব ভাষায় যেন আমি বঙ্গবন্ধুর দরাজ কন্ঠ শুনতে পাচ্ছিলাম। দ্রুত চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিলাম, এ বার্তা পৌঁছে দিই এ অঞ্চলের আওয়ামী লীগ হাই কমান্ডের কাছে। অর্থাৎ চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী প্রেসিডেন্ট এম, আর, সিদ্দিকীর কাছে।

এম, আর, সিদ্দিকী গত রাত হতে তাঁর বাসভবনে নেই। জনাব এ, কে, খানের বাসভবনে ফোন করে সিদ্দিকী সাহেবকে চাইলাম। … বেগম লতিফা সিদ্দিকী (কোহিনূর আপা) ফোনে এলেন। আমার কাছ হতে দ্রুত বার্তাটি লিখে নিয়েই কোহিনূর আপা প্রশ্ন রাখলেন: আপনি ফরেন প্রেসকে এ বার্তা দিয়েছেন তো? আপনার দেওয়া উচিত।

বললাম: আমি এখনই দিয়ে দিচ্ছি।

বললাম বটে, কিন্তু কি উপায়ে বার্তাটি বিদেশে পাঠানো যায়? সব টেলিযোগাযোগ ত বন্ধ। আমার দুই ঘনিষ্ট বন্ধু দৈনিক পিপল্স ভিউ সম্পাদক নুরুল ইসলাম এবং চট্টগ্রাম রেডিও স্টেশনের নিউজ এডিটর সুলতান আলীর সাথে ফোনে পরামর্শ করলাম। তারাও কোন উপায় বাৎলাতে পারলো না।

ঠিক করলাম সব প্রয়োজনীয় সরকারী অফিস ও আধা সরকারী অফিসে আমার পরিচয় না দিয়ে ফোনে বার্তাটি জানিয়ে দেব। জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার হতে শুরু করে চট্টগ্রাম পোর্ট ট্রাস্ট পর্যন্ত যেখানে যেখানে কর্মকর্তাদের ফোন নাম্বার আমার কাছে ছিল, সে সব জায়গায় ফোন করলাম। আমার পরিচয় দিলাম না; তাঁরা সাগ্রহে বার্তাটি লিখে নিলেন। এ ভাবে অনেকগুলি ফোন করলাম । মাত্র দুটি অফিসে বার্তাটি নিতে অসম্মত হল । তাদের দাবী ছিল: আগে বলেন আপনি কে বলছেন। কিন্তু আমি পরিচয় দিতে অস্বীকার করলাম।

কোহিনূর আপার কাছ হতে বার্তাটি পেয়েই এম, আর, সিদ্দিকী আমাকে ফোন করলেন। আলোচনায় ঠিক হলো, আমি তাঁকে সব ডেভেলপমেন্ট অবহিত করে যাব। তবে, ফোনে তাঁকে ‘সিদ্দিকী’ বলা যাবে না। তাঁর ডাক নাম ‘আলম’ বলেই সম্বোধন করবো। আমি তো অরিজিনাল ‘আলম’ আছিই।

সুলতান আলী ফোন করলেন। বললেন, আগ্রাবাদ ব্রডকাস্টিং হাউস তো অচল। ওঁরা কালুরঘাটের চান্দগাঁও ট্রান্সমিশন স্টেশনটি ব্যবহার করছেন না কেন?”

আমি বললাম: চান্দগাঁও স্টেশনে কি ব্রডকাস্টিং স্টুডিও এখনও আছে?

সুলতান আলী উত্তেজিত ভাবে বললেন, হাঁ আছে। আগ্রাবাদ ব্রডকাস্টিং হাউসের কোন সাহায্য ছাড়াই চান্দগাঁও স্টেশন হতে সরাসারি ব্রডকাস্টিং করা যায়। ওঁদের বলেন, যা কিছু ওখান হতে ব্রডকাস্ট করতে।

তথ্যটি পেয়ে আমি উল্লসিত হয়ে তখনই সিদ্দিকী সাহেবকে ফোন করে জানালাম। টেকনিক্যাল ব্যাপারটি জেনে সিদ্দিকী অত্যন্ত অনুপ্রাণিত হলেন। আগ্রাবাদ রেডিও হাউস ছাড়া ব্রডকাস্টিং করা যায় না, এ ধারণায় তাঁরা বেতারে প্রচারের চিন্তা মন থেকে বাদ দিয়েই বসেছিলেন। এখন সানন্দে বললেন: আমি এখনই দেখছি।

চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগ প্রেসিডেন্ট এম, আর, সিদ্দিকীর প্রচেষ্টায় ২৬ শে মার্চ শেষ বিকেলের দিকে জেলা আওয়ামী লীগ নেতা এম, এ, হান্নান নিজের পরিচয় না দিয়ে চান্দগাঁও রেডিও স্টেশন হতে বঙ্গবন্ধুর বার্তাটি পাঠ করে ব্রডকাস্ট করেন। তবে, সে সময়ের দারুণ অস্বস্তিকর সময়ে খুব কম লোকই জানতো যে চট্টগ্রাম বেতারের কোন ব্রডকাস্টিং হতে পারে। তাই এম, এ, হান্নানের এ প্রচার খুব কম সংখ্যক লোকই জানতে পেরেছিল।

তবে চট্টগ্রাম বেতারের চান্দগাঁও স্টেশনের ব্রডকাস্টিং ক্ষমতার উপর ভিত্তি করেই জেগে উঠলো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, চট্টগ্রামের বুকে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়!

লেখক: চট্টগ্রামের প্রবীণতম সাংবাদিক, প্রবাসী।

চট্টগ্রামের হাজার বছরের ঐতিহ্য ‘সাম্পান’


কর্ণফুলী নদীর হাজার বছরের ঐতিহ্য ‘সাম্পান’। এক সময়ে এ বাহনটি কর্ণফুলী, হালদা ও সাঙ্গু নদীতে চলাচল করতো। পরে তা এখানকার অন্যান্য নদী, খাল-বিলে এটি ছড়িয়ে পড়ে। তবে সাম্পান প্রথম সৃষ্টি হয় কর্ণফুলী নদীতে। প্রচলন আছে যে, কর্ণফুলী নদীতে একসময় যাত্রীবাহী জাহাজ ও স্টিমার চলাচল করতো। জাহাজ থেকে নেমে যাত্রীরা নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে কূলে ওঠার জন্য সাম্পানের সৃষ্টি হয়। এটি পৃথিবীর অন্য কোথাও নেই। কর্ণফুলীর সাম্পান নিয়ে রচনা হয়েছে অসংখ্য গান আর কবিতা। এই সাম্পান ওয়ালারাই ছিলেন একসময় অসংখ্য নারীর স্বপ্নের পুরুষ। তাইতো আঞ্চলিক গানের সম্রাজ্ঞী শেফালি ঘোষের কণ্ঠে সেই গান আজো সংগীত প্রিয় মানুষের মনে দোলা দেয়।

‘ওরে সাম্পান ওয়ালা…..তুই আমারে করলি দিওয়ানা।
বাহার মারি যারগই সাম্পান
কি বা ভাটি, কি বা উজান।
বন্ধু বিনে পরান বাঁচে না-রে
ওরে সাম্পান ওয়ালা….তুই আমারে করলি দিওয়ানা।’
কর্ণফুলী নদীতে কি পরিমাণ সাম্পান চলাচল করে তার কোন পরিসংখ্যান জানা যায়নি। তবে সাম্পানের কয়েকজন মাঝির সাথে কথা বলে জানা গেছে, এক যুগ আগেও এ নদীতে সাম্পান চলাচল করতো কমপক্ষে দুই হাজার। বর্তমানে এ সংখ্যা কমে হয়েছে কয়েকশ’। নদীর দু’ধারে নতুন নতুন রাস্তাঘাট নির্মাণের কারণে মানুষের মধ্যে নদী নির্ভরতা হ্রাস পাচ্ছে। ফলে এ নদীর ঐতিহ্য সাম্পান এখন হারিয়ে যাচ্ছে। এতে অনেকে মাঝি (সাম্পান চালক) পেশা পরিবর্তন করেছে। তারপরও বাপ-দাদার পেশা আজো ধরে রেখেছেন কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী উপজেলা বোয়ালখালীর চরণদ্বীপ ইউনিয়নের মসজিদঘাট এলাকার বাসিন্দা দৌলত মাঝি (৬০)। তিনি জানান, বিগত ৩০ বছর ধরে তিনি সাম্পানের মাঝি। একসময় সাম্পান নিয়ে তিনি কর্ণফুলী নদী হয়ে হালদাসহ বিভিন্ন এলাকায় যাত্রী নিয়ে যাতায়াত করতেন। কিন্তু এখন নদী পথে যাত্রী কমে যাওয়ায় সাম্পান নিয়ে দূরে কোথাও যেতে হয় না। বর্তমানে তিনি সাম্পানে করে চরণদ্বীপ মসজিদঘাট থেকে রাউজানের বাগোয়ান ইউনিয়নের লাম্বুরহাটে যাত্রী পারাপার করেন। এতে তার প্রতিদিন আয় হয় ১৫০ থেকে ২০০টাকা।

তিনি জানান, সাম্পান বিভিন্ন সাইজের হয়ে থাকে। ছোট আকারের একটি সাম্পানের দৈর্ঘ্য আনুমানিক ২০ ফুট এবং প্রস্থ কমপক্ষে সাড়ে ৪ ফুট। এ ধরনের একটি সাম্পানে ১৫ থেকে ১৮ জন যাত্রীধারণ হয়। এছাড়াও এ সাইজের চেয়ে আরো বড় সাম্পান রয়েছে। এগুলোতে যাত্রীধারণ ক্ষমতা রয়েছে ৩০ থেকে ৩৫ জন।

কর্ণফুলী নদী ঐতিহ্য প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল কাশেম জানান, ‘কর্ণফুলী নদীর বর্তমান যে বিবর্ণ অবস্থা তা অতীতে ছিল না। অতীতে চট্টগ্রাম বন্দরে নির্মিত জাহাজ রপ্তানি হতো সারা বিশ্বে।’
সাম্পানইতিহাস থেকে জানা যায়, সপ্তদশ শতকে তুরস্কের সুলতানের নৌ বহরের অধিকাংশ জাহাজ নির্মিত হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দরে। একবার এক আদেশে সুলতান চট্টগ্রাম চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ১৩টি জাহাজ ক্রয় করেছিলেন। বৃটিশ নৌ বহরেও চট্টগ্রামে নির্মিত জাহাজের প্রাধান্য ছিল। ১৯২৪ সালে কলকাতা বন্দরে ১১টি বৃটিশ জাহাজের মধ্যে ৮টিই ছিল চট্টগ্রামের তৈরি।

১৯০০ শতকে চট্টগ্রামে এক হাজার টন ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন জাহাজ তৈরি হতো। সিজার ফ্রেডারিক লিখেছেন প্রতিবছর চট্টগ্রাম থেকে ২৫ থেকে ৩০টি জাহাজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হতো। চট্টগ্রামের তৈরি জাহাজ আলেকজেন্দ্রিয়ায় তৈরি জাহাজের চেয়ে উন্নত ছিল। জার্মানির ব্রেমার হ্যাভেন জাদুঘরে এখনও চট্টগ্রামের তৈরি জাহাজ প্রদর্শনীর জন্য রক্ষিত আছে। এই ক্ষুদ্র রণতরীটি ১৯১৮ সালে নির্মিত হয়েছিল।

একটা টিম দরকার। যে টিম লেখালেখি করে এবং করবে। এই চট্টগ্রামের গল্প, চট্টগ্রামের অলিগলির গল্প, গ্রামগঞ্জের গল্প, স্কুলের গল্প, স্কুল মাষ্টারের গল্প। এক কথায় যাদের লেখায় উঠে আসবে চট্টগ্রামের ইতিহাস, ঐতিয্য, বর্তমান।
আছেন কেউ আগ্রহী? একটি মেইল পাঠান : amaderchattagram@gmail.com এ।

লালদিঘির ইতিহাস



লালদিঘি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম শহরের ঐতিহ্যবাহী স্থান সমূহের অন্যতম। নগরীর জেল রোডের শেষ সীমানায় এর অবস্থান। ২.৭০ একর জায়গা জুড়ে অবস্থিত লালদীঘি। এর একপাশে আছে আন্দরকিল্লা। এর আশেপাশে আছে জেলা পরিষদ ভবন এবং স্থানীয় ব্যাংকের শাখাসমূহ। এটি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ৩২ নং ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত।

ইতিহাস : ১৭৬১ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চট্টগ্রামের শাসনভার লাভ করে। সেই সময় এন্তেকালী কাছারি অর্থাৎ জমি সংক্রান্ত তহসিল অফিসে (বর্তমানে মেট্রোপলিটন পুলিশ অফিস) লাল রঙ দেয়া হয়েছিল। এটিকে লোকজন তাই “লালকুঠি” বলে চিনত। এই লাল কুঠির পুর্ব দিকে ছিল জেলখানা। এটিকে ও লাল রঙ করা হয়েছিল এবং তাই এটি “লালঘর” নামে পরিচিতি লাভ করে। এই ভবন দুটো লাল পাগড়ী পরিহিত ব্রিটিশ পাহাড়াদারেরা পাহাড়া দিত। অনেকেই মনে করেন এ কারনেই ভবনগুলোর নাম লাল ঘর এবং লাল কুঠি। লাল ঘর এবং লাল কুঠির পাশে একটা ছোট পুকুর ছিলো। চট্টগ্রামে ইংরেজ শাসনের সূচনালগ্নে পুকুরটিকে বড় করে দীঘিতে পরিণত করা হয়। পাশেই দুটো লাল রঙের ভবন ছিল বলেই এই দিঘিটা লালদিঘি নামে পরিচিত হয়।

লালদিঘির মালিকানা : লালদিঘির উত্তর পাশে রয়েছে একটা মঠ যার গম্বুজে লেখা আছে ১৯৩৯ সাল। এটার গায়ে লেখা আছে রায় বাহাদুর রাজকমল ঘোষের নাম। রায় বাহাদুর ছিলেন একজন জমিদার। তাঁর নিজ বাড়ি ছিল রাউজান উপজেলার চিকদাইর গ্রামে। তিনি অবসর সময় কাটাতেন তখনকার খোলামেলা লালদিঘির পাড়ে। তিনি ছিলেন লালদিঘির অভিভাবক। পরবর্তিতে তিনি দিঘিটির মালিকানা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের হাতে তুলে দেন।

রিকেট ঘাট : লালদিঘির পশ্চিম পাড়ে ছিলো “রিকেট ঘাট”। ১৯৪১ হতে ১৯৪৮ পর্যন্ত চট্টগ্রামের কমিশনার হিসাবে দায়িত্ব পালন করা স্যার হেনরী রিকেটস এর স্বরণে চট্টগ্রামের জমিদারেরা এই ঘাট নির্মাণ করেছিলেন। মিঃ হার্ভে ১৮৩১-১৮৩৯ সালে চট্টগ্রামের কালেক্টর ছিলেন। তিনি ৩২ ডেপুটি কালেক্টর ও কয়েকজন জরিপ আমিন নিয়ে জরিপের কাজ শুরু করেন। জরিপে তিনি ২০ গন্ডার স্থলে ১৮ গন্ডায় কানি হিসাব করেন। একারনে তাঁর উপর সবাই এত অসন্তুষ্ট হয়েছিল যে আনোয়ারা থানায় লোকজন তাকে আক্রমণ করে। তিনি তারপর সৈন্যদের গুলি করার নির্দেশ দেন। এই খবর পেয়ে কর্ত্‌পক্ষ মিঃ রিকেটকে প্রেরণ করে। ১২০০ মঘীর জরিপের সময় চট্টগ্রাম বাসীর উপকার করে তিনি সকলের শ্রদ্ধাভাজন হয়েছিলেন। ঊনবিংশ শতকে চট্টগ্রামের সেশন জজ টোডেল সাহেবের মৃত্যুর পর তাঁর শবদেহ রিকেট ঘাটের উত্তর দিকে দাহ করা হয়। তাঁর স্মৃতিতে নির্মাণ করা স্তম্ভটি পরবর্তীকালে ভেঙ্গে ফেলা হয়।

লালদিঘির ময়দান : মেট্রোপলিটন পুলিশ সদর দপ্তরের পাহাড়ের পাদদেশ থেকে পশ্চিমে পরীর পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত পুরো জায়গাটা সেকালে মিউনিসিপাল ময়দান নামে পরিচিত ছিল। ১৮৮৭ সালে এই ময়দানে মহারানী ভিক্টোরিয়ার মূর্তি স্থাপন করা হয়। চল্লিশের দশকে স্বাধীনতা আন্দোলনের যুগে এই মূর্তি অপসারন করা হয়। ঊনবিংশ শতকের শেষে উত্তর-দক্ষিণ রাস্তাটি হবার পর মিউনিসিপাল ময়দান দুইভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। পূর্ব দিক সাধারণ জনগনের খেলার মাঠে রূপান্তরিত হয়। মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে তখন সে মাঠ মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠে পরিনত হয়। এই মাঠ এখন লালদিঘির মাঠ নামে পরিচিতি লাভ করেছে।

লালদিঘির কিংবদন্তি : লাল দীঘির ঘটনা নিয়ে চট্টগ্রামের মানুষের মুখে একটা কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। একবার এক দিনমজুরের মেয়ে ঐ দিঘীতে গোছল করতে নেমেছিলো। হঠাৎ পায়ে শিকল বেঁধে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো জলের নিচে একটা দেশে। আসলে ঐটা ছিলো এক বাদশার দরবার। সেই বাদশার বিয়ে ঠিক হয়েছিল লাল বেগমের সাথে। একদিন বাদশা লাল বেগমকে দেখতে চাইলেন কিন্তু খবর পাওয়া গেলো লাল বেগম তার মুল্লক থেকে এক ক্রীতদাসের সাথে পালিয়েছে। এ খবর বাদশা তখন জানতেন না। তাই মজুরের ঐ মেয়েকে নিয়ে আসা হয়েছে বাদশার সাথে লাল বেগমের অভিনয় করার জন্য। অনেক কথাপ্রসঙ্গে বাদশা মেয়েটার আসল পরিচয় জেনে যায়। ক্ষুদ্ধ বাদশার নির্দেশে সবাই আসল লাল বেগমকে খুজতে লেগে গেলো। তখন জানা গেলো সে অন্দর কিল্লার দীঘি থেকে দু’শ হাত দূরে পর্তুগীজদের কিল্লায় আছে। বাদশা ঐ কিল্লায় আক্রমণ করে। অনেক অনেক খুনে লাল হয়ে গেলো দিঘীর পানি। বাদশা পরাজিত হল সেই যুদ্ধে। সবাই পালিয়ে গেল। তবুও সে দিঘির পাড়ে বাদশা থেকে গেল লাল বেগমকে উদ্ধার করার আশা নিয়ে। এই নিয়ে একজন চারন কবি লিখেছেনঃ “লালদিঘিতে আগুন ধরে/জল শুকিয়ে গিয়েছে,/মাছগুলো সব ডাঙ্গায় উঠে/কিলবিল করতে লেগেছে“।
অনুষ্ঠান : লালদিঘির পাড়ে ১৯১০ সালে বৈশাখের ১২ তারিখ আবদুল জব্বার সর্বপ্রথম বলীখেলা অনুষ্ঠান করেন। তখন থেকে প্রতি বছর বৈশাখের ১২ তারিখ লালদিঘির পাড়ে জব্বারের বলীখেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। বর্তমানে লালদিঘির পশ্চিম পাড়ে একটি মসজিদ আছে। শহরবাসীর চিত্তবিনোদনের জন্য এখানে একটি সবুজ গাছপালা ঘেরা পার্ক আছে।

তথ্যসূত্র
  1. ঝাঁপ দাও “চট্টগ্রামের ইতিহাস, ওহীদুল আলম, পৃ ৬, পৌষ ১৩৯৬ বাংলা, বইঘর, চট্টগ্রাম”।
  2. ঝাঁপ দাও “চট্টগ্রাম মহানগরীর ইতিহাস ঐতিহ্য, শতদল বড়ুয়া, পৃ ১৩০, ২০০৬, নূর প্রকাশনী, চট্টগ্রাম”
  3. ঝাঁপ দাও “চট্টগ্রামের ইতিহাস, ওহীদুল আলম, পৃ ৬৬, পৌষ ১৩৯৬ বাংলা, বইঘর, চট্টগ্রাম”
  4. ঝাঁপ দাও “চট্টগ্রামের ইতিহাস, চৌধূরী শ্রীপূর্নচন্দ্র দেববর্ম্মা তত্ত্বনিধি, পৃ ৯১-৯২,প্রথম প্রকাশঃ ৪ঠা আষাঢ় ১২৮২ মঘী, গতিধারা, ঢাকা”
  5. ঝাঁপ দাও “বন্দর শহর চট্টগ্রাম, আবদুল হক চৌধুরী, পৃ ৯০, ২০০৯, গতিধারা, ঢাকা”।
  6. ঝাঁপ দাও “কিংবদন্তির গল্প চট্টগ্রাম, সুচরিত চৌধুরী, বাংলা একাদেমী, ঢাকা”
  7. ঝাঁপ দাও “বন্দর শহর চট্টগ্রাম, আবদুল হক চৌধুরী, পৃ ২৩৮, ২০০৯, গতিধারা, ঢাকা”

সন্দ্বীপের গৌরবের কিছু তথ্য উপাত্ত



আজকাল সন্দ্বীপ সম্পর্কে জানার অদম্য ইচ্ছা প্রায়শই বিভিন্ন লেখা-লেখিতে প্রকাশ পায়। বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম যারা আমাদের এ দ্বীপে হাজার বছরের ঐতিহ্যের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে গিয়ে দ্বীপের অজানা কথা জানতে অনেকের জন্য কষ্টসাধ্য বটে। আমি শুধু আজকে যারা এ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করছেন যাদের মধ্যে জানার আগ্রহ তাদের জন্যই আমার আজকের প্রকাশনা। আমি অত্যন্ত আনন্দিত হবো যখন দেখি প্রযুক্তি নির্ভরযুগের সন্দ্বীপের প্রতিটি ছাত্র কল্যাণমুখী, মননশীলতা তার সৃষ্টিশীলতায় যারা নিয়োজিত রয়েছে তারা যেন দ্বীপের ঐতিহ্য জেনে সমৃদ্ধি লাভ করে।

১। খ্রীষ্ট্রীয় সপ্তম শতাব্দির বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে প্রথম লেখক বাঙ্গালীর আদি কবি মিননাথ সন্দ্বীপের অধিবাসী। তাঁর উত্তর পুরুষদের মধ্যে সন্দ্বীপের নাথ সম্প্রদায়ের লোক প্রাচীন কবিয়াল শ্রী প্রাণকৃষ্ণ কৈবর্তক ও শ্রীরাম দাস কৈবর্তক।

২। সপ্তম শতাব্দি থেকে তিন হাজার বছরের প্রাচীন দ্বীপ সন্দ্বীপের সহিত আরব বণিকগণের ব্যবসায়ীক সম্পর্ক ছিল। তখন থেকেই আরব বণিকগণ সন্দ্বীপের উপনিবেশ স্থাপন ও স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।

৩। নবম শতাব্দির শেষভাগে সুলতান বায়েজিদ বোস্তামি নামক বিখ্যাত সাধক স্বীয় ওস্তাদ আবু আলীর আদেশক্রমে সিন্ধু দেশ থেকে ইসলাম প্রচারের জন্যে সন্দ্বীপে আগমন করেন।

৪। ১০৪৭ খ্রীষ্টাব্দে মীর সৈয়দ সুলতান মাহমুদ মাহী সওয়ার বলকী নামক একজন মহাজ্ঞানী দরবেশ সন্দ্বীপে আসেন এবং ধর্ম প্রচার করেন।

৫। ১৩০০ শতাব্দিতে সুবিখ্যাত বারো আউলিয়া সন্দ্বীপে পদার্পণ করে যোহরের নামাজ আদায় করেন। এদের মধ্যে থেকে প্রসিদ্ধ সাধক বখতিয়ার মৈশূর সন্দ্বীপে বসতি স্থাপন করেন। রহিনিতে তাঁর মাজার ছিল। প্রাচীন জমিদার আবু তোরাব চৌধুরী তাঁরই বংশধর।

৬। ১৩৪৫ খ্রীষ্টাব্দে পর্যটক ইবনে বতুতা চীন যাওয়ার পথে এদেশে সফর করেন। তিনি চট্টগ্রাম, সন্দ্বীপ ও উপকূলীয় দ্বীপে বহু আরবকে বসবাস করতে দেখেন।

৭। ১৪১২ খ্রীষ্টাব্দে (৮৩৮ হিজরী) হযরত শাহ আলী বোগদাদী সন্দ্বীপ আগমন করে ইসলাম প্রচারের কাজ করেন।

৮। ১৫০০ শতাব্দীতে সন্দ্বীপের সমৃদ্ধি বঙ্গ বিজেতা মুসলমানের দৃষ্টি আকর্ষন করে। এ সময় রাজধানী থেকে অনেক মুসলিম ও সম্ভ্রান্ত পরিবার সন্দ্বীপ এসে স্থায়ীভাবে বসবাস আরম্ভ করে।

৯। ১৫৬৫ খ্রীষ্টাব্দে বিশ্ব ভ্রমণকারী নাগরিক সিজার ফ্রেডরিক সন্দ্বীপ থেকে একটি গরু ও একটি মুরগী ১ টাকা পৌনে ৯ আনা দিয়ে ক্রয় করেন। তিনি সন্দ্বীপবাসীকে 'মুর' (A reach of Arab) বলে উল্লেখ করেন।

১০। ১৫৮২ খ্রীষ্টাব্দে বঙ্গের সুবেদার রাজা টুডোর মল্ল 'সন্দ্বীপ পরগণা' সরকার ফাতেহাবাদের অন্তর্ভূক্ত করে সন্দ্বীপের রাজস্ব নির্ধারণ করেন।


১১। ১৬০২ খ্রীষ্টাব্দে নৌ যোদ্ধা বিশারদ কেদার রায় বিদেশী সেনাধ্যক্ষ কার্ভারোল এর সাহায্যে মোঘলের হাত থেকে সন্দ্বীপকে স্বাধীন করে নেয়।

১২। ১৬০৩ খ্রীষ্টাব্দে ফতেহ খাঁ সন্দ্বীপের শাসনভার গ্রহণ করে দিমাতুর শের এর অধীনে সন্দ্বীপ শাসন করতে থাকেন। ফতেহ খাঁ এর পতাকায় লেখঅ থাকতোঃ আল্লাহর রহমতে ফতেহ খাঁ সন্দ্বীপের সুলতান, খ্রীষ্টানদের রক্তপাতকারী এবং পূর্তগীজ জাতির ধ্বংসকারী।

১৩। ১৬০৯ খ্রীষ্টাব্দে গঞ্জালিসের সৈন্যবাহিনীর সাথে সন্দ্বীপের মুসলমান সৈন্যদের যুদ্ধ হয়।

১৪। ১৬১০ খ্রীষ্টাব্দের কিছু আগে থেকে গঞ্জালিস সন্দ্বীপের স্বাধীন নৃর প্রতি ছিলেন। তাঁর দেশরক্ষা বাহীনিতে ২০০০ সশস্ত্র বাঙ্গালী সৈন্য, কামান সজ্জিত ৮০ খানা জাহাজ, ২০০ অশ্বারোহী সৈন্য ও ১০০০ পূর্তগীজ সৈন্য ছিল।

১৫। ১৬১৫ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত গঞ্জালিস সন্দ্বীপের শাসনকর্তা ছিলেন। ১৬১৬ সালে তার পতনের পর চির দিনের জন্য সন্দ্বীপের পূর্তগীজ শাসনের অবসান হয়।

১৬। ১৬১৬ খ্রীষ্টাব্দে গঞ্জালিসকে পরাজিত করে আরাকান রাজ সন্দ্বীপের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব হস্তগত করেন। একই বছর রাজা দেলোয়ার খান আরকান রাজাকে পরাজিত করে সন্দ্বীপের সাহিত্য শাসনকারী জনগণের সহযোগিতায় প্রায় অর্ধশতাব্দির জন্য স্বাধীন সন্দ্বীপের নৃর প্রতি হন। তাঁর রাজত্বকালে সন্দ্বীপের জনসাধারণ সুখে-শান্তিতে দিন কাটাতো।

১৭। ১৬১৮ থেকে ১৬২২ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে ইব্রাহীম খাঁর সুবেদারী আমলে নবাবের যুদ্ধস্তুত নেতা দেলোয়ার খাঁ অনেক শাহী প্রজাকে সন্দ্বীপে তাঁদের পরিবার নিয়ে বসবাসে বাধ্য করেন।

১৮। ১৬৬৫ সালে ৯ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার, নবাবের সেনাপ্রধান আবুল হোসেন সন্দ্বীপ দূর্গ আক্রমণ ও দখল করেন। ১৯শে নভেম্বর সুলতান দিলালের পতনের সঙ্গে সঙ্গে এ ক্ষুদে রাষ্ট্রের স্বাধীনতার সূর্য চিরতরে অস্তমিত হয়।

লেখক আলী হায়দার চৌধুরী বাবলু, মহাসচিব, বায়রা।

সূত্রঃ সন্ধীপ নিউজ ২৪ 

চট্টগ্রামে ভাষা আন্দোলন



পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার চক্রান্ত শুরু করে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী। প্রথমে এর বিরুদ্ধে ঢাকায় প্রতিবাদ-বিক্ষোভ-সমাবেশ ঘটলেও ক্রমে তা সারা পূর্ব বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। চট্টগ্রামে রাষ্ট্রভাষার আন্দোলন গড়ে ওঠে কবি-লেখক-সংস্কৃতিতকর্মীদের নেতৃত্বে।
১৯৫১ সালে চট্টগ্রামের হরিখোলার মাঠে ৪ দিনব্যাপি সংস্কৃতি সম্মেলনে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ সভাপতির যে ভাষণটি প্রদান করেন সেটি পূর্ব বাংলার স্বাধিকার চিন্তা ও জাতির সাংস্কৃতিক আধারকে বেগবান করে তোলে, ঐ ভাষণে তিনি বলেন, ‘মানুষের মানুষে বিভেদ আছে সত্য। এই বিভেদকে জয় করাই শক্তি। সংস্কৃতি ঐক্যের বাহন, বিভেদের চামুণ্ডা নয়।’
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত আন্দোলন-সংগ্রামের তুঙ্গপর্বে চট্টগ্রামের এই সাংস্কৃতিক আন্দোলন দেশব্যাপি লেখক-বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীদের ব্যাপক অনুপ্রেরণা দেয়। এই সম্মেলনের প্রভাবে চট্টগামে গণতান্ত্রিক ও শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলনও জোরদার হয় এবং পাকিস্তানের শাসক-শোষক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রবল হয়ে ওঠে।
১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে ধর্মঘট ও হরতাল পালিত হয়। আন্দরকিল্লায় আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। তরুণ সাহিত্যিক মাহবুব-উল-আলম চৌধুরীকে আহ্বায়ক, আওয়ামী মুসলিম লীগ চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক এম এ আজিজ ও রেল শ্রমিক নেতা চৌধুরী হারুনর রশিদকে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়। কমিটিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ক্লাব, যুব সম্প্রদায়, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শ্রমজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত হন।
চট্টগ্রামে ছাত্র-ছাত্রীদের ভূমিকাও ছিলো উল্লেখযোগ্য, ৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিকে ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করতে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। আবদুল্লাহ আল হারুনকে আহ্বায়ক, মোহাম্মদ আলী (চবি প্রাক্তন ভিসি) ও ফরিদ উদ্দিন আহমদ (সাংবাদিক, কায়রো বিমান দুর্ঘটনায় নিহত) কে যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়। চট্টগ্রামের ছাত্র-ছাত্রীরা আন্দোলনে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন।
ভাষা আন্দোলনের ডাক চট্টগ্রামের গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে রাজনৈতিক ও ছাত্র নেতৃত্বের পাশাপাশি রাজনীতিসচেতন শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী ও তরুণ লেখকরা বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। তারা চট্টগ্রাম শহর ও গ্রামাঞ্চলে গণসংগীত, কবিগান ও নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের মর্মবাণী ও পূর্ব বাংলার মানুষের জাতীয়তাবাদী ও স্বাধিকার চেতনা ছড়িয়ে দেন।

সূত্র : চট্টগ্রামে ভাষা আন্দোলন, শরীফ শমসির ও নানা সাময়িকী

পটিয়া উপজেলার পটভূমি

ষষ্ঠ শতকে পটিয়াসহ চট্টগ্রাম সমতট রাজ্যভুক্ত হয়। সপ্তম শতক অবধি সমতটের খড়ুগ রাজবংশের রাজাদের দ্বারা শাসিত হয়। অষ্টম শতকে ধর্মপালের রাজত্বকালে তা পাল সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। নবম শতকে পটিয়াসহ চট্টগ্রাম আবার হরিকেল রাজ্যভুক্ত হয়। দশম শতক থেকে সপ্তদশ শতকের মধ্যবর্তী সময় অর্থাৎ ১৬৬৬ সন পর্যন্ত সাময়িক বিরতি থাকলেও চট্টগ্রাম সমগ্র দক্ষিণাঞ্চল আরাকান রাজ্যভুক্ত ছিল। বৌদ্ধযুগে চট্টগ্রাম ‘চক্রশালা’ নামে বহির্বিশ্বে পরিচিত ছিল। এ চক্রশালা পটিয়া সদর থেকে দুই মাইল দক্ষিণে অবস্থিত। আরাকান শাসকরা চক্রশালায় তাদের রাজধানী স্থাপন করেন। রাজা মেং ফালোং (সেকান্দার শাহ) এর শাসনকালে (১৫৭১-৯৩ খ্রি.) ‘চক্রশালা’ রাজধানী ছিল যেখানে চট্টগ্রামের দক্ষিণাংশ ও কক্সবাজার তাঁর দখলে ছিল। পটিয়াসহ পুরো চট্টগ্রাম মোগল সাম্রাজ্যভুক্ত হয় সম্রাট আকবরের বাংলা বিজয়ের আরো নববই বছর ১৬৬৬ সনে তাঁর প্রপৌত্র সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে। ব্রিটিশ শাসনের আগে এতদঞ্চল আরাকান আমলে ‘চক্রশালা’, মোগল আমলে ‘চক্রশালা পরগণা’ এবং ব্রিটিশ শাসনের প্রথম দিকে ‘চাকলা’ নামেই পরিচিত ছিল। ব্রিটিশ সরকার দক্ষিণ চট্টগ্রামের কেন্দ্র পটিয়ায় ১৯১০ সালে ৫জন মুন্সেফ নিয়ে মহকুমা মুন্সেফ কোর্ট স্থাপন করেন এবং তদানিন্তন পঁাচ থানার প্রশাসনিক কার্য পরিচালনার জন্য একজন সার্কেল অফিসার (ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট) নিয়োগ করেন। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে পটিয়ার ও রাউজানের কিছু অংশ নিয়ে রাঙ্গুনিয়া থানা গঠিত হয়। পরবর্তীতে পটিয়াকে ভেঙে ১৮৯৮ সালে আনোয়ারা, ১৯৩০ সালে বোয়ালখালী ও ১৯৭৬ সালে চন্দনাইশ থানা গঠিত হয়। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তান আমলে পটিয়া মহকুমা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।১৯৮৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পটিয়া উপজেলা  হিসাবে স্বীকৃতি  পায়। (সূত্র: পটিয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্য : এসএমএকে জাহাঙ্গীর)



সীতাকুন্ড উপজেলার পটভূমি



প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর উদার এবং মুক্ত প্রকৃতির ছন্দময় মুর্চ্ছনায় ,দিগন্ত বিস্তারী গগনের সরল সৌহার্দ্যে গরিয়ান বীর চট্টলার উপকন্ঠ সীতাকুন্ড । ইতিহাসের মহিমায় প্রোজ্জ্বল তার শত যোজনার সাগর গিরি নদীর আবেষ্টন। এখানকার মাটি আর মানুষের বৈচিত্র্যময় জীবন ধারা মন ও প্রাণকে উদ্বেলিত করে। প্রায় ৩৫ কি.মি.বিস্তৃত সাগর সৈকতের প্রান্ত ছুঁয়ে আছে ঘন উপকুলীয় বন। সমুদ্র অবগাহনে মেতে উঠে নির্সগ । পূর্বে শ্যামলীমাময় বিচ্ছিন্ন সু-উচ্চ গিরিশৃঙ্ঘ পরিদৃশ্যমান ও বনসম্পদে সুশোভন ,বিস্তৃত আবাসভুমি আর ফসলের অবারিত মাঠ। এ যেন কবির কবিতার উপপাদ্য শহর, পর্যটকের ধ্যানভূমি ।পাহাড় আর সমুদ্র বেষ্টিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সীতাকুন্ড।সমুদ্রের কোল ঘেষে জাহাজভাঙ্গা শিল্প এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।



সীমা ও অবস্থানঃ-সীতাকুন্ডের পশ্চিমে তরঙ্ঘ বিক্ষুব্ধ সমুদ্র দ্বীপ সন্দ্বীপ চ্যানেল। পূর্বে শ্যামল মুর্তির পাহাড় - যে পাহাড়ের বুক চিড়ে রুপালী ঝর্ণাধারা বয়ে চলেছে সাগর পানে।সীতাকুন্ডের সংলগ্ন ফঠিকছড়ি ও হাটহাজারী থানা,দক্ষিণে প্রাচ্যের রাণী খ্যাত বন্দর নগরী চট্টগ্রামের পাহাড়তলী থানা, উত্তরে মীরসরাই থানা ।সীতাকুন্ডে মোট ০৯ টি ইউনিয়ণ ও ০১ টি পৌরসভা বিদ্যমান।



চট্টগ্রাম নগরীর ৯ কি.মি. উত্তরে রাজধানী ঢাকা থেকে ২১৯ কি.মি.দক্ষিণে - ৩৫ কি.মি. দৈর্ঘ বিশিষ্ট গিরিসৈকতের মিলন কেন্দ্র বার আউলিয়ার পূণ্যভূমিতে ২২.৩৭অক্ষাংশ (উঃ) এবং ৯১.৪০ দ্রাঘিমাংশ (পূর্ব) সীতাকুন্ড থানার অবস্থান।

থানা সদর হতে চট্টগ্রামের দুরত্ব ৩৭ কি.মি এবং ঢাকার দুরম্নত্ব ২২৭ কি.মি ।



নামকরনঃ- সীতাকুন্ডের নামকরন সম্পর্কে অনেক কিংবদন্তী আছে। ইতিহাসের দৃষ্টিকোন থেকে নামকরনের সত্যতা সম্পর্কে জোরালোভাবে কিছু বলা যাবে না। হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকে মনে করেন রামায়ন বর্ণিত সীতা এখানে আগমন করেন এবং একটি কুন্ডে স্নান করেন ।সেই হতে সীতাকুন্ডে নামের উৎপত্তি।কারো কারো মতো রাম স্বয়ং তার পত্নীর নামেই সীতাকুন্ড নাম করন করেন। আবার কেহ কেহ মনে করেন দক্ষ রাজার মহাযজ্ঞের সময় ক্ষিপ্ত উম্মত্ত শিব তার পত্নী সতীর শবদেহ খন্ড বিখন্ড করেন এবং তার নামানুসারে সীতাকুন্ড কালের বির্বতনে বিকৃত হয়ে সীতাকুন্ড হয় ।অর্থ্যাৎ হিন্দু ধর্মের পুরাণিক উপাখ্যানে নারদ মুনির ভূমিকা সর্বজন বিদিত। নারদ মুনির ভূমিকা থেকে স্পষ্ট হয় যে দক্ষরাজার কন্যা পার্বতী মা বাবার অগোচরে ভালবেসে বিয়ে করেন শিবকে এতে রাজা ক্ষিপ্ত হয়ে এিভূবনের সবাইকে আমন্ত্রন জানালেন।সেখানে শিবকে অপদস্ত করার জন্য তার মূর্তি বানিয়ে রাজপ্রাসাদের তোরনের বাহিরে প্রহরী হিসাবে রাখা হল।নারদ মুনি থেকে পার্বতী একথা জানতে পেরে নিজেই প্রত্যক্ষ করলেন এবং লজ্জায় অপমান দেহত্যাগ করলেন। পার্বতী বেচে নেই জেনে উম্মত্তপ্রায় শিব পার্বতীর মৃতদেহ মাথায় নিয়ে প্রলয় নাচন শুরু করলেন। এক পর্যায়ে বাহান্ন খন্ডে খন্ডিত পার্বতীর দেহ বাহান্ন স্থানে নিক্ষিপ্ত হয়ে বাহান্নটি তীর্থ কেন্দ্রের উদ্ভব হয়। তম্মধ্যে সীতাকুন্ডও একটি। সতী পার্বতীর উরুসন্ধীর অংশ এখানে নিক্ষিপ্ত হয়েছে বলে কথিত আছে। তবে হিন্দু ও তান্ত্রিক গ্রন্থগুলোতে সীতাকুন্ডের নাম সুস্পষ্ট নয়।এসব উপাখ্যান বৃটিশদের দলিল দস্তাবেজের মাধ্যমে জানা যায়।



আরও একটি তথ্য পাওয়া যায় এভাবে যে, পিতৃ আদেশে শ্রীরামচন্দ্র পত্নী সীতা দেবী ও কনিষ্ঠ ভ্রাতা লক্ষনকে নিয়ে বনবাসী হন এবং এখানে কিছুদিন অবস্থান করেন । সে সুবাধে তাদের নামানুসারে স্বয়ম্ভুনাথ মন্দিরের পাদদেশে রামকুন্ড, লক্ষণকুন্ড,সীতাকুন্ড নামে তিনটি কুন্ড এবং একটি সীতার মন্দির ও বিদ্যামান ।

১৭৬১ সালের ৫ জানুয়ারী চট্টগ্রামের প্রথম ইরেজ চীফ নিযুক্ত হন হ্যারী(-) যাত্রা বিরতিকালে সীতাকুন্ড ক্যাম্প হতে পোর্ট উইলিয়ামের নিকট তিনি যে চিঠি লিখেন তাতে সীতাকোন নামে উল্লেখ দেখা যায়।

সীতাকুন্ড বঙ্গভারতের হিন্দুদের পূণ্যভুমি তীর্থস্থান হিসেবে খ্যাত । প্রতি বৎসর শিবচতুর্দশী মেলা উপলক্ষে ভারত ,বাংলাদেশ ও বিভিন্ন দেশ থেকে অসংখ্য তীর্থ যাত্রীর সমাগম ঘটে সীতাকুন্ডে পূন্যতা লাভের জন্য ।

মীরসরাই উপজেলার পটভূমি

চট্টগ্রাম জেলার মীরসরাই উপজেলা ১৬টি ইউনিয়ন নিয়ে ১৯১৭ সালের ১৫ জুলাই প্রতিষ্ঠা হয়। ঐ সালের ২১ সেপ্টেম্বর গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হওয়ার পর ১৯১৮ সালের ১ জানুয়ারী থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মীরসরাই থানার কার্যক্রম চালু হয়।


নামকরণ ও প্রাসাঙ্গিক ইতিহাসঃ

১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গদেশ জয়ের পর বাংলাদেশে ইসলাম ধর্ম প্রচার ও প্রসার বহুলাংশে বৃদ্ধি পায় । অবশ্য অষ্টম শতকেই চট্টগ্রামে আরব দেশের বণিকদের আগমণ ঘটে । চট্টগ্রাম অঞ্চল বন্দর , পাহাড় , নদী-সাগর ও উর্বর ভূমি এবং প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়াতে বিদেশিদের মনযোগ আকর্ষণ করে। তাছাড়া দূর ও নিকট প্রাচ্যের দেশগুলোতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে মাধ্যম হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দর বিশেষ পরিচিতি পায়। আরবীয় বণিকদের সাথে সাথে ধর্ম প্রচারকদের আগমণের ফলে চট্টগ্রামের সামাজিক রাজনৈতিক ,অর্থনৈতিক ও সাংস্কূতিক ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটে ধর্ম প্রচারক সুফী সাধকগনের মাধ্যমে । চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে তা আরো বেশি প্রযোজ্য । এখানে উলেস্নখ্য যে , মধ্যযুগে ভারতবর্ষে ধর্মের আবির্ভাবের প্রাক্কালে নিমণবর্ণের হিন্দুরা সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বর্ণ-বৈষম্য ও অর্থনৈতিক যাঁতাকলে পড়ে নিষ্পেষিত হচ্ছিল । উচ্চ বর্ণের ব্রাহ্মণদের হাতে নির্যাতিত হিন্দুরা মুক্তির পথ খুঁজছিল । এসময় নবাগত ইসলাম ধর্ম সকলের সামনে মুক্তি ও সৌভাগ্যের দরজা খুলে দেয়। দলে দলে মানুষ ইসলাম ধর্মের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় লাভ করে । ভারতবর্ষের বৌদ্ধরা ও নির্যাতত হয়ে ক্রমশ: আরাকানের বৌদ্ধ শাসিত চট্টগ্রামের দিকে সরে আসছিল । ভারতবর্ষের সামাজিক , সাংস্কূতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অসহনীয় ও অস্থির এই প্রেক্ষাপটে মুসলমান ব্যবসায়ী ও সৈন্যদের সাথে মুসলিম ধর্মপ্রচারকগণ চট্টগ্রামে আগমণ করেন। অমায়িক ব্যবহার , সেবাধর্মী মনোভাব , ধৈর্য-সহিষতা , খোদাভত্তি ও ভীতি সাধারণ মানুষের মনে গভীর আগ্রহ সৃষ্টি করে। এখানকার স্থানীয় মানুষ দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। পীর দরবেশগণ চট্টগ্রামে মসজিদ , মক্তব ও খানকাহ প্রতিষ্ঠা করে ধর্মীয় প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি স্থাপন করেন। ঐতিহাসিক ড. আবদুল করিম বলেন ‘ বাংলায় মসজিদ স্থাপনের পর থেকে মুসলমানরা একটি সামাজিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হন। ’ ঐতিহাসিকদের অভিমত , ১২২০ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী ২/২’শ বছরে যেখানে ৩ লাখ মুসলমান বসবাস করতো সেখানে ১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দে সে সংখ্যা দাঁড়ায় দেড় কোটির ওপর । চট্টগ্রামের ক্ষেত্রেতে এ পরিসংখ্যান আরো বেশি প্রযোজ্য। ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় পূর্ববাংলা ছিল অপেক্ষাকৃত দুর্গম ও অধিক অনুন্নত । তাই এখানে ইসলাম প্রচার একটু বেশি দেরিতেই হয়। চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচার ও এখানে মুসলমানদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে আরো দেড়’শ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল । সড়কপথে চট্টগ্রামে যাওয়ার কোন পথ ছিল না । অসংখ্য নদী- ছড়ায় পরিপূর্ণ অঞ্চলটি বছরের পুরো সময় পানিতে তলিয়ে থাকতো । তাছাড়া চট্টগ্রাম শত শত বছর ধরে আরাকানী মগদের শাসিত ছিল এবং ত্রিপুরার সাথে প্রায়ই যদ্ধবিগ্রহ লেগে থাকতো । সমুদ্রপথ ও ছিল ভীতিকর । আরাকানী জলদস্যুর অত্যাচারে সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষ ছিল দিশেহারা । চট্টগ্রাম অঞ্চল সত্যিকার অর্থেই ছিল ‘মগের মুলস্নুক’। এমন পরিস্থিতিতে প্রখ্যাত সুফী হযরত বদর শাহ চট্টগ্রামে আসেন ও ইসলাম প্রচারে নিয়োজিত হন। তাঁর সাথে এসে যোগ দেন বেশ ক’জন আউলিয়া-দরবেশ, যারা বার আউলিয়া নামে পরিচিত হয়। কিন্তু আরাকানী মগ শাসিত চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচারের পরিবেশ মোটেও অনকূল ছিল না । নানা বাধা-বিপত্তি ও অত্যাচার নির্যাতন চলে নবদীক্ষত মুসলমানদেন ওপর। হযরত বদর শাহ (রঃ) ইসলাম প্রচারের প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপন করে বাংলার সুলতান ফখরম্নদ্দীন মোবারক শাহ (১৩৩৮-৫০) কে চট্টগ্রামে অভিযান পরিচালনার আহবান জানান। সুলতান সে আহবানে সাড়া দিয়ে সেনাপতি কদল খানকে চট্টগ্রামে অভিযান পরিচালনা করেন ও আরাকানী সৈন্যদের বিতাড়িত করেন। গাজী উপাধিতেক ভূষিত হন সেনাপতি কদল খান। কিন্তু মুসলমানদের প্রথম চট্টগ্রাম বিজয় নিয়ে কোন ঐতিহাসিক তথ্যাদি পাওয়া যায়না । চট্টগ্রাম বিজয়ের প্রায় তিন’শ বছর পর চট্টগ্রামের কবি মোহাম্মদ খান তাঁর মক্তুল হোসেন কাব্য রচনা করেন। সেই কাব্যে নিজের বংশ মর্যাদার কথা লিখতে গিয়ে কবি মোহাম্মদ খান লিখেছেন-

এক মনে প্রণাম করম বারে বার

কদল খান গাজী পীর ত্রিভুবন সার।।

যার রণে পড়িল অক্ষয় রিপুদল

ভএ কেহ মজ্জিগেল সমুদ্রের তল।।

এক সর মহিন হৈল প্রাণ হীন

রিপু জিনি চাটিগ্রাম কৈলা নিজাধীন।।

কবি পুসত্মকের আকার বৃদ্ধি পাবার আশংকায় চট্টগ্রাম বিজেতা কদল খান গাব্দী, শায়খ শরীফ উদ্দিন ও বদর আলম অর্থাৎ হযরত বদর শাহ ব্যতিত বার জন আউলিয়ার অন্যদের নাম বলেননি। চট্টগ্রাম বিজয়ের মাত্র ছয় বছর পর ১৩৪৬ সালে চট্টগ্রাম আসেন বিশ্বখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা্ । তিনি চট্টগ্রাম হয়ে সিলেট যান ও সেখানে অবস্থানরত সিলেট বিজেতা হযরত শাহ জালাল ইয়েমেনীর সাথে দেখা করেন। চট্টগ্রাম অধিকারের পর এখানে মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং প্রচুর সংখ্যক সুফী দরবেশ আগমণ করেন । চট্টগ্রামের আনাচে কানাচে তাঁরা ছড়িয়ে পড়েন। সে সময় পর্যমত্ম মীরসরাইর স্বতন্ত্র কোন নাম জানা যায় না, চট্টগ্রামের অংশ হিসেবেই ছিল তার পরিচিতি । পরবর্তীতে আলা উদ্দিন হোসেন শাহের আমলে চট্টগ্রামের উত্তর- পশ্চিমাঞ্চল শাসন করেন লস্কর পরাগল খান ও তৎপুত্র ছুটি খান। এসময় এ অঞ্চল লস্করপুর নামে পরিচিত হয়। লস্করপুর একটি প্রশাসনিক অঞ্চল ,এখানে রাজসভা ছিল , ছিল সভাকবি । যেখানে বাংলা সাহিত্য চর্চা হতো। ছিল সৈন্যবাহিনী , সভাসদ ও প্রশাসনিক দপ্তর । সুলতানী আমলের পর চট্টগ্রামে শাসনভার চলে যায় সুর বংশের নিজাম শাহ সুরের হাতে। তিনি জাফরাবাদে রাজ্য স্থাপন করেন । এখানে ও রাজসভা ছিল । ছিল সভাকবি । যেখানে বাংলা সাহিত্য চর্চা হয়েছে। ছিল সৈন্য সামমত্ম , সভাসদ ও প্রশাসনিক দপ্তর । জাফরাবাদ মীরসরাই’র পশ্চিমাঞ্চলের নদী তীরবর্তী স্থান ,যা ফেনী নদী ভাঙনে বিলীন হয়েছে। তবে জাফরাবাদে নামে মৌজা রয়েছে সীতাকুন্ড ও মীরসরাইতে। চট্টগ্রামের অন্যনাম জাফরাবাদ একথা জানা যায় এই রাজ্যের সভাকবি ও রাজস্ব উজির বাহরাম খানের ‘ইমাম বিজয়’ কাব্যে-

সহর জাফরাবাদ নামে চাটিগেরাম

তথাতে বৈস এ পীর বদ(র.) আলম।।

দো আদশ আউলিয়া বর জগত উত্তম

একে ২ স্থাপিত মোকাম মনোরম্।।

এই জাফরাবাদ রাজ্যই পরবর্তীকালে নপতি নিজাম শাহের নামে নিজামপুর পরগনা রূপে প্রকাশ পায়। উলেস্নখ্য যে , নিজাম শাহের রাজত্বের প্রায় অর্ধ শত বছর পর ১৬১৬ সময় থেকে নিজামপুর নাম ইতিহাসে পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে জাফরাবাদ শহরটি ফেনী নদীতে বিলীন হয়ে যায়্ । গবেষক শেখ এটিএম রম্নহুল আমিনের মতে‘‘হনডেন ব্রকের অংকিত মধ্যযুগের একটি মানচিত্রে ফেনী সাগর সংগমে জাফরাবাদ নামে একটি বন্দরের উলেস্নখ আছে । সে বন্দর নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। ’’ তাঁর মতে ‘‘দৌলত উজির বাহরাম খানের কাব্যে বণির্ত ‘ সহর জাফরাবাদ এবং ব্রকের মানচিত্রের ‘ জাফরাবাদ বন্দর ’ এক এবং অভিন্ন।’’ নিজামপুর পরগনার একাধিক জাফরাবাদ মৌজা রয়েছে । ১৮৩৭-৩৮ সালে লেফটেন্যান্ট এইচ , সিডনস ইঞ্জিনিয়ার চট্টগ্রাম জেলা জরিপ করেন । এসময় প্রস্ত্ততকৃত ম্যাপে অমত্মত : ১০টি জাফরাবাদ নাম পাওয়া যায়। তন্মধ্যে ৭ টি মৌজা বর্তমান মীরসরাইতে অমত্মভুর্ক্ত হয়েছে। যেগুলো পরবর্তীতে সময়ে সময়ে নাম পরিবর্তন করে যথাক্রমে মোটবাড়িয়া , পুর্ব মিঠানালা , মিঠাছড়া, রাঘবপুর , রাজাপুর , বামনসুন্দর ও পশ্চিম মলিয়াইশ নামে নামকরণ হয়েছে। এবার আসা যাক মীরসরাই নামকরণ প্রসঙ্গে। ১৪৯৩ খ্রিস্টাব্দে আলা উদ্দিন হোসেন শাহ গৌড়ের সিংহাসনে আরোহণের পূর্ববর্তী দুই দশক দেশের পরিস্থিতি অশামত্ম ছিল এসময় চট্টগ্রামের শাসক ছিলেন রাসিত্ম খাঁ। তাঁর পুত্র পরাগল খাঁ ও তৎপুত্র ছুটি খাঁ উত্তর চট্টগ্রামের শাসক করতেন পরাগলপুরে রাজধানী স্থাপন করে। এসময় চট্টগ্রামের অধিকার নিয়ে ত্রিপুরা ও আরাকানী সৈন্যদের সাথে মুসলিম সৈন্যদের যুদ্ধ হয়। ১৫১৩ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরা রাজা ধন্যমানিক্য চট্টগ্রাম জয় করেন। কিন্তু সহসাই গৌড়ের অধীনে চলে আসে চট্টগ্রাম। এসকল যুদ্ধে আলা উদ্দিন হোসেন শাহ কে মতামত্মরে নসরৎ শাহকে সৈয়দ আলফা হোসাইনী নামক বাগদাদেন বনী হাশেমী এক বনিক যুদ্ধ নৌকা , অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করেন। স্বয়ং সুলানের পরিবারের সাথে তাঁর বৈবাহিক সম্পর্কে স্থাপিত হয়। জানা যায় ,১৫১১ খ্রিস্টাব্দে সৈয়দ আলফা হোসাইনী চট্টগ্রাম আসেন। তিনি ১৪টি বাণিজ্যিক জাহাজের মালিক ছিলেন। চট্টগ্রাম বিজয়ের পর হোসেন শাহ ( মতামত্মরে নসরৎ শাহ) আলফা হোসানীকে অনেক ভূসম্পতি প্রদান করেন এবং তিনি স্থায়ীভাবে চট্টগ্রামে বসবাস শুরম্ন করেন। চট্টগ্রাম শহরের কাজীর দেউরীর বিখ্যাত কাজী পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা মীর আবদুল গণির তিনি পূর্বপুরম্নষ ছিলেন। চট্টগ্রাম বিজয়ের পর সুদূর গৌড়ের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা , চট্টগ্রামের সুরক্ষা এবং সৈন্য ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের থাকা এ যাতায়াতের সুবিধার্থে হোসেন শাহের আমলে চট্টগ্রামে একাধিক সরাইখানা বা মেহমানসরাই প্রতিষ্ঠা করা হয়। কথিত আছে এসকল মেহমান সরাই বা সরাইখানা প্রতিষ্ঠা করেন সৈয়দ আলফা হোসাইনি । জানা যায় , সে সময় ফেনী নদী পার হয়ে চট্টগ্রাম পৌছা পর্যমত্ম অমত্মতঃ চারটি স্থানে সৈন্যরা বিশ্রাম নিতেন। স্থানগুলো হচ্ছে বুড়বুড়িয়া , মীর কা সরাই, সীতাকুন্ড ও কদমরসুল । সেসময়কার ইতিহাসে উত্তর চট্টগ্রামে অমত্মতঃ দু’টি সরাইখানার নাম পাওয়া যায় একটি মীর কা সরাই অপরটি ভাটিয়ারীতে। বস্ত্ততঃ ফেনী নদী পার হয়ে একটি রাসত্মা জোরওয়ারগঞ্জ হয়ে ( পরাগলপুরের ভেতর দিয়ে) মীরসরাই ও সীতাকুন্ড হয়ে চট্টগ্রাম পর্যমত্ম পৌছেঁ যায়। এটিই সেকালে গ্র্যান্ড ট্র্যানক রোড বা ‘ফখরম্নদ্দীনের পথ’ নামে পরিচিত , যার চিহ অদ্যবধি বিদ্যমান। মীরসরাইতে যে মেহমানসরাই প্রতিষ্ঠিত হয় তা পরিচালনার ভার অর্পন করা হয় জনৈক মীর সাহেব নামে কোন সুফী ব্যক্তির উপর। কেউ কেউ তাঁকে সৈনিক বলেও অভিহিত করেছেন। এই মীর সাহেব মেহমানসরাইতে সারাজীবন অতিবাহিত করেন এবং তাঁর নামানুসারে এই সরাইখানা বা মেহমানসরাইটি মীর কা সরাই নামে পরিচিত হয়। স্কটল্যান্ডের অধিবাসী ও বৃটিশ ইন্ডিয়ার বিখ্যাত সমীক্ষক ফ্রান্সিস বুকানন ১৭৯৮ খ্রিস্টাব্দে ৮ মার্চ তারিখে চট্টগ্রাম ভ্রমণে যান। তিনি তাঁর ভ্রমন বৃত্তামেত্ম লিখেছেন ‘‘ বিকাল ৩টা নাগাদ আমি ফেনী বাংলো ত্যাগ করলাম । তারপর আরো ১২মাইল ভ্রমণের পর পৌছুলাম মীর খা সরাই। যাত্রীদের জন্য এখানে ও থাকার একটি ব্যবস্থা আছে । ’’ তিনি ১১মে তারিখে চট্টগ্রাম ভ্রমন শেষে ফেরার সময় মীর খা সরাইতে রাত্রিযাপন করেন এবং জোরারগঞ্জ হয়ে লক্ষ্ণীপুরের দিকে যাত্রা করেন। এই মীর খা সরাই বা মীর কাসরাই পরবর্তীতে মীরসরাই নামে পরিচিতি লাভ করে । কিন্তু এই মীর সাহেব সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা যায় না । ( এই সম্পর্কে বিসত্মারিত জানার জন্য মৎ প্রণীত ‘ মীরসরাই’র ইতিহাস সমাজ ও সংস্কৃতি ’ জুলাই ২০০৪ প্রথম অধ্যায় পৃষ্ঠা ৪৭-৫১) । এই প্রবন্ধে বলা হয়েছে মীরসরাই অঞ্চলে অবস্থিত মেহমারসরাই বা সরাইখানাটি পরিচালনার দায়িতে ছিলেন কোন অজ্ঞাতনামা মীর সাহেব। তিনি মীর গফুর খাঁ নামে পরিচিত । গফুর খাঁ সাহেবের পুত্র পরিচিত চৌধুরী কাদের ইয়ার খাঁ চট্টগ্রামের নিজামপুর পরগনার বিখ্যাত জমিদার ও ঐতিহাসিক ব্যক্তি । তিনি তৎকালীন সরকার থেকে বিপূল পরিমাণ সম্পত্তির মালিকানা পান । তাঁর একমাত্র কন্যার বিবাহ দেন বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খাঁর আমলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের দোহাজারী দুর্গের অধিপতি ও এক হাজারী মনসবদার আধু খাঁর পুত্র শের জামাল খাঁর সাথে । উপহার হিসেবে মূল্যবান জিনিসপত্রের সাথে বাঁদী -গোলাম , মোলস্না-কাজী ও ক্বারী কয়েক ঘর দেওয়া হয়েছিল । খুব ধুমধামের সাথে এই বিয়ে হয়, যা চট্টগ্রামের ইতিহাসে বিশেষ গুরম্নত্বের সাথে উলেস্নখ করা হয়। চৌধুরী কাদের ইয়ার খাঁর দুই পুত্র চৌধুরী দেয়ানত খাঁ ও চৌধুরী আমানত খাঁ । চৌধুরী আমানত খাঁ চিরকুমার ছিলেন । দেয়ানত খাঁ বিবাহ করেন চট্টগ্রামের প্রাচীন বনেদী ও সৈয়দ আলফা হোসানীর বংশধর মীর আবদুল গণির পেীত্র মীর এহিয়ার (চট্টগ্রাম অঞ্চলের শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রয়েছে তাঁর। )তিন কন্যার অন্যতম আয়মনা বিবিকে। এই দম্পতির ঘরে জন্মগ্রহণ করেন হাড়ি বিবি্। তিনি ও চিরকুমারী ছিলেন । শোনা যায় উপযুক্ত পাত্র পাওয়া না যাওয়ায় না তিনি বিবাহ করেননি্ । অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি মারা যান্ । কোন উত্তরাধিকারী রেখে না যাওয়াতে বাকী খাজনার দায়ে (মতামত্মরে চক্রামত্মমুলকভাবে) এই পরিবারের বিপুল সম্পত্তি (যা তরফ আমানত -দেয়ানত নামে পরিচিত) নিলামে বিক্রি হয়। কলকাতার খিদিরপুরের বাসিন্দা ইসলামাবাদে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম চিফ হ্যারি ভেরলেস্ট এর দেওয়ান গোকুল চন্দ্র ঘোষাল তার ভ্রাতুস্পুত্র জয়নারায়ণ ঘোষোলের নামে খরিদ করে নেন। খিদিরপুর ভূকৈলাসের নামানুসারে মীরসরাই’র আবুতোরাব বাজারের নামকরণ হয়্। কৈলাসগঞ্জ বাজার । ( এই সংক্রামত্ম বিসত্মারিত জানার জন্য মীরসরাইর ইতিহাস সমাজ ও সংস্কৃতি পৃষ্ঠা ৫৪-৫৬ এবং ৬৬৫-৬৬৮)। মীর গফুর খাঁ তৎপুত্র চৌধুরী কাদের ইয়ার খাঁ ও এই বংশের অন্যান্যদের কে মৃত্যুর পর সরাইখানা সংলগ্ন গফুর খাঁ (গোভনীয়া ) দীঘির পশ্চিম পাড়ে দাফন করা হয় । বিশ শতকের পঞ্চাশ দশক পর্যমত্ম এলাকাটি জঙ্গলাকীর্ণ ছিল । আমবাড়িয়া নিবাসী জনৈক সেকান্দর হাজী জায়গাটি স্কুল কর্তৃপক্ষ থেকে খরিদ করেছিলেন। তিনি বন জঙ্গল পরিস্কার করার সময় পাকা কবরের সন্ধান পান এবং মীর গফুর খাঁ সাহেবের কবর বলে শনাক্ত করে সমাধি ভবন তৈরী করেন। সম্মানিত মীর গফুর খাঁ সাহেবের এটি সমাধি , যা ঢাকা - চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে বিদ্যমান। মীরসরাই থানা (পুলিশ ক্যাম্প) ভবনের কিঞ্চিৎ দক্ষিণে এটি অবস্থিত। এখন প্রশ্ন হল তৎকালীন ইসলামাবাদের উত্তর-পশ্চিমাংশের মীর কা সরাই বা সরাইখানাটি যিনি দেখাশুনা করতেন সেই মীর সাহেব বা মীর গফুর খাঁ সাহেব আর পরবর্তী নিজামপুর পরগনার প্রখ্যাত জমিদার চৌধুরী কাদের ইয়ার খাঁ (কাজিয়ার খাঁ ?)র পিতা মীর গফুর খাঁ একই ব্যক্তি? অন্ততঃ তিনটি বিবেচনা একই ব্যক্তি হতে পারেন। সময়কাল , তৎকালীন শাসকদের সাথে সুস্পর্ক ও উত্তরাধিকারী এই তিনটি বিষয় পর্যালোচনা করা আবশ্যক। একই সাথে গুরম্নত্বপূর্ণ বিষয় হলো মীর কা সরাই কখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে , সুলতানী আমলে না মোগল আমলে ? এই বিষয় ও পরিস্কার হওয়া দরকার । তবে চৌধুরী কাদের ইয়ার খাঁর পিতা মীর গফুর খাঁই ছিলেন মীর কা সরাই এর তত্ত্বাবধানকারী এই সত্যকে ধরে এগোলে প্রমাণিত হয় সরাইখানাটি প্রতিষ্ঠিত হয় মোগল যুগে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে সেনাপতি বুজর্গ উমেদ খাঁ কর্তৃক চট্টগ্রাম দখলের পর । এসময় বিজিত অঞ্চলের নামকরণ হয় ইসলামাবাদ । সময়কাল বিবেচনায় আলাউদ্দিন হোসেন শাহ বা নসরৎ শাহ’র শাসনকালে সৈয়দ আলফা হোসানী কর্তৃক সরাইখানা প্রতিষ্ঠিত হলে সেটা ১৫১৬-৩২ খ্রিস্টাব্দে মধ্যেকার সময় হবে । এসময় ইসলামাবাদ নামে অঞ্চলে বা নিজামপুর পরগনার অসিত্মত্ব মিলবে না এবং জমিদার চৌধুরী কাদের ইয়ার খাঁর জমিদারীর চিমত্মা ও অযৌক্তিক । দোহাজারী দুর্গের অধিপতির সুযোগ্য পুত্র শের জামাল খাঁর সাথে তাঁর কন্যার বিবাহ হলে সময়টা হতে পারে মোগলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের পর । অপরদিকে চৌধুরী দেয়ানত খাঁ বিবাহ করেন চট্টগ্রামের কাজীর দেউড়ির মীর আবুল গণি (সপ্তদশ অষ্টাদশ শতকের লোক যিনি সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে ইসলামাবাদের কাজী ও মূফতি ছিলেন) এর পুত্র মীর আবদুল রশিদ (জম্ম-সপ্তদশ শতকের শেষার্ধ ,যিনি দিলিস্নর সম্রাট আহমদ শাহ ( ১৭৪৮-৫৪ খ্রিঃ) এর শাসনকালে বাংলার নবাব কর্তৃক ৬০ দ্রোন নিস্কর জমি পান) এর পুত্র মীর এহিয়ার কন্যাকে। ১৭৫৪ সালের দিকে মীর আবদূল রশিদ বার্ধক্যে উপনীত হন এটা নিশ্চিত এবং মীর এহিয়া সেসময় পূর্ণ বয়স্ক ব্যক্তি ছিলেন ধরে নেওয়া যায়্। অর্থাৎ অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে এই বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়। ঘটনাবলী এরকম হলে মীর গফর খাঁ , তৎপুত্র চৌধুরী কাদের ইয়ার খাঁ তৎপুত্র দেয়ানত খাঁ ও আমানত খাঁ এবং দেয়ানত খাঁর কুমারী মেয়ে হাড়ি বিবির সময়কালের সাথে ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে মোগলদের চাটিগ্রাম বা চট্টগ্রাম বিজয় ও এই অঞ্চলে মেহমানসরাই বা মীরখা সরাই এর পরিচালনার বিষয় ধারাবাহিক মিল পাওয়া যাচ্ছে্ । উত্তরাধিকারী না থাকাতে এই জমিদারী নিলামে বিক্রির ঘটনা ও ঘটে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইসলামাবাদ অধিকারের পর। দ্বিতীয়ত - সরাইখানা বা মেহমান সরাই প্রতিষ্ঠার পর এর পরিচালনার ব্যয়ভার বহনের জন্য আশপাশে কয়েকগ্রাম ও সম্পত্তি নিস্কর করে দেওয়া হয়েছিল , যা ছিল মোগল আমলের প্রচলিত রীতি। পিতার মৃত্যর পর মীরকা সরাই পরিচালনা এবং একই সাথে সম্পত্তির মালিকানা স্বত্ব লাভ করেন চৌধুরী কাদির ইয়ার খাঁ। চট্টগ্রামের ইতিহাসে চৌধুরী কাদির ইয়ার খাঁ ,তারঁ বংশধর ও তাঁদের পরিণামের কথা উলেস্নখ পাওয়া যায়। এই পরিবারের সমাধির সংক্ষিপ্ত বিবরণ জানা যায় মঘাদিয়া নিবাসী সাবেক সাব ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এসএম সিদ্দিক আহমদ লিখিত পারিবারিক ইতিহাস থেকে। পক্ষান্তরে গৌড়ের সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ বা তৎপুত্র নাসিরম্নদ্দীন নসরৎ শাহ এর আমলে সৈয়দ আলফা হোসাইনী কর্তৃক মেহমানসরাই প্রতিষ্ঠিত এবং মীর গফুর সাহেব নামক কোন অজ্ঞাতনামা সৈনিক বা সুফী দরবেশ কতৃর্ক পরিচালিত হয়ে থাকলে তাঁর সাথে নিজামপুর অঞ্চলের ইতিহাসেখ্যাত জমিদার চৌধুরী কাদের ইয়ার খাঁ বা কাজিয়ার খাঁর কোন সম্পর্ক কালের নিরিখে মেলে না । সে ক্ষেত্রে মীর গফুর খাঁ সাহেবের কথিত সমাধি ভবনের ও কোন হদিস পাওয়া যাবে না । কারণ এখানে যে কবর রয়েছে তা চৌধুরী কাদির ইয়ার খাঁর বংশধরদেরই কবর ( এসএম সিদ্দিক আহমদ সাহেবের সাÿ্য অনুযায়ী)। এখানে প্রসঙ্গেক্রমে আর একটা কথা বলে নেওয়া দরকার । তাহলো , মীর কা সরাই অর্থাৎ সরাইখানা প্রতিষ্ঠা তৎকালীন জাফরাবাদ রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা (দিলিস্নর সম্রাট শের শাহের ভাই) নিজাম শাহ সুরের (ষোল শতকের মধ্যভাগে ) আমলেও হতে পারে । কারণ শের শাহের আমলে ভারতবর্ষে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা , ডাক বিভাগ ও সরাইখানার ব্যাপক প্রচলন হয়েছিল । সাম্রাজ্যের সার্বিক খোজঁখবর নেওয়া , প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদুঢ় করা ও দ্রুত সংবাদ আদান প্রদানের ক্ষেত্রে শের শাহ এর শাসনকাল আধুনিক যুগোপযোগী ও যা ছিল বর্তমানের অনুকরণীয় । সে সময়কালে মীরকাসরাই প্রতিষ্ঠিত হলেও নিজামপুরের জমিদার চৌধুরী কাদের খাঁর পিতা গফুর খাঁ ও সরাইখানার তত্ত্বাবধানকারী মীর সাহেব ভিন্ন ব্যক্তি। ইসলামাবাদের উত্তর পশ্চিমাংশে গুরম্নত্বপূর্ণ অঞ্চল টিতে (যে সময়েই হউক) যে সরাইখানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তার পরিচালক বা তত্ত্বাবধানকারী সেই মীর সাহেবের নামে মীর কা সরাই এবং যা থেকে পরবর্তী কালে মীরসরাই নামকরণ হয়েছে এতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

মীরসরাই নামের বানান বিভ্রাটঃ

নামকরণ ও মীর সাহেবের পরিচিতির মত মীরসরাই নামের বানান নিয়েও চলছে নানান বিভ্রামিত্মমুলক প্রচারণা । সরকারী ও বেসরকারী বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ইচ্ছেমত বানান লিখে চলেছেন। এই যাবত ৩১রকম বানান দেখতে পাওয়া যায়। মিরেরসরাই ,মরেরশরাই, মীরেরশ্বরীই, মীরেরস্বরাই,মীরসরাই,মিরসরাই, মিরশ্বরাই, মিরশরাই, মিরছরাই, মীরছরাই, মিরছরি, মেরছরাই,মীরশ্বরী, মিরশ্বরি, মীরশ্বোরাই, মীরছোরাই,মীরকা সরাই, মীরকাছরাই, মীরকে সরি , মীরকেছরি , মীরকেছরি , মীর কা ছরি , মিরেশ্বরী,মীর খা ছরাই ও মীরসরাই। প্রসঙ্গে উলেস্নখ্য যে , মীরসরাই নামকরণ হয়েছে সরাইখানার পরিচালক বা তত্ত্বাবধানকারী জনৈক মীর সাহেব এর নামে প্রথমে মীরকা সরাই থেকে পরবর্তীকালে এই মীরকা সরাই সংক্ষিপ্ত রূপ প্রাপ্ত হয়ে মীরসরাই নামকরণ । ১৯৮৩ সালের ১৫এপ্রিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হুসাইন মুহম্মদ এরশাদ এর শাসনামলে মীরসরাইকে উপজেলা হিসেবে ঘোষনা করে এবং এর কার্যক্রম হয় ৬ অক্টোবর্। কিছু দিনের মধ্যে প্রথম উপজেলা নিবার্হী অফিসার এম, আলী আহমদ এক সার্কুলার জারি করেন ‘ মীরসরাই ’ বানান শুদ্ধভাবে এবং একই নিয়মে লেখার জন্য । যেহেতু মীর সাহেব নামক ব্যক্তি সরাইখানা পরিচালনা করেছেন এবং তারঁই নামের স্মারকরূপে এই প্রাচীন জনপদের নামকরণ হয়েছে্ । কিন্তু দীর্ঘ পঁচিশ বছরেও এই সার্কুলার কার্যকর করা যায়নি । বাংলাদেশের জন্য কোন অঞ্চলে এমন দৃষ্টামত্ম নজির বিহীন । এই বিষয়ে মীরসরাই’র সাংবাদিক , সহিত্যিক, সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে কিন্তু পরিতাপের বিষয় তাঁদের ভূমিকা এই বিভ্রামিত্ম ও বিকৃতি নিরসন করতে পারেনি । এক্ষেত্রে প্রশাসনিক পদক্ষেপই কাম্য। ঐতিহাসিক নিদর্শন ও স্থানঃ হিঙ্গুলী কোটেরপাড়ঃ বাংলাদেশের প্রাচীন যুগের সামরিক নিদর্শনাদি বিশেষতঃ পাথুরে স্থাপনা বেশি নেই। এখানকার মাটি বালুকাময় ও পলিমিশ্রিত । নদী নদী ও নরম মাটির পাহাড় বেষ্টিত চট্টগ্রামে পাথর সহজলভ্য নয়। তাই প্রাচীন ও মধ্যযুগে নিত্য যুদ্ধ বিগ্রহের সময় ভারতবর্ষের অন্যান্য স্থানে প্রচুর দুর্গ নির্মিত হলেও চট্টগ্রামে মাটির দুর্গই বেশী নির্মিত হয়েছে। মীরসরাই থানার হিঙ্গুলীতে আরাকানী শাসনামলে নির্মিত একটি মাটির দুর্গ রয়েছে । আরাকানীরা উত্তর পশ্চিম দিক থেকে ত্রিপুরা ও গৌড়ীয় সেনাবাহিনীর অগ্রাভিযান প্রতিরোধ করতে এই দুর্গ নির্মান করে। একটা বিরাট এলাকার চারপাশে মাটির উঁচু পাড় ও চার পাড়ে চারটি বিশালাকার দরজা বিশেষ । এটি চট্টগ্রাম অঞ্চলে আরাকানী যুগের প্রতিরক্ষা ও প্রশাসনিক নির্দশন। কিন্তু কালের ভয়াল আক্রোশ থেকে সাত শতাধিক বছর রক্ষা পেলেও মানুষের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা পায়নি এই ঐতিহাসিক নিদর্শন। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত পূর্ব ও দক্ষিণ পাড় সম্পূর্ণ অক্ষত এবং উত্তর পাড় আংশিক (পশ্চিম পাড় হিঙ্গুলী খালের ভাঙনে বিলীন) টিকে থাকলেও ইটভাটা ও বসতি স্থাপনকারীদের হাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। মাটির এই দুর্গটি কোটের পাড় নামে পরিচিত এবং কোটের অভ্যন্তরে ৫০ একরের বেশি জমি ছিল। ছোট আকৃতির পাহাড় সমান পাড়গুলি ইটভাটায় ইট প্রস্তুতকারীদের হাতে নিশ্চিহ্ন হয়েছে (কোট বা দূর্গের ছবি ও তথ্য জানতে- মীরসরাই'র ইতিহাস সমাজ ও সংস্কৃতি পৃষ্ঠা-১৬৫)।

ভুলে যাওয়া ইতিহাস - চট্টগ্রাম এর একশত মুসলিম মনিষী

সাগর ও পাহাড়ের সন্ধিস্থলে বাংলাদেশের সর্বদক্ষিন ভুখন্ড চট্টগ্রাম। ঐতিহাসিকভাবে এই এলাকা বিখ্যাত তার বন্দর এর জন্য। বৃটিশ ভারতে চট্টগ্রামকে বলা হত শেষ গুরুত্বপুর্ন শহর। মোগল ও তৎপূর্ব আমলেও চট্টগ্রাম ছিল একটি অতি গুরুত্বপূর্ন অঞ্চল। সুলতানি আমলে চট্টগ্রামে আলাদা প্রশাসক নিয়োজিত ছিল যিনি সরাসরি সুলতান এর কাছে দায়ি ছিলেন। বাংলাদেশে ইসলামের প্রবেশদার ছিল চট্টগ্রাম। প্রাক ইসলামি যুগ থেকেই চট্টগ্রাম এর সাথে নৌবানিজ্য সম্পর্ক ছিল আরব থেকে চিন পর্যন্ত। চট্টগ্রামে এখনও মালয়শিয়া-ইন্দোনেশিয়ার অধিবাসি অনেকে বিবাহসুত্রে আছেন। সেসব দেশেও আছেন অনেকে। মালয়শিয়ার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রি মাহাথির মুহাম্মদ এর পূর্বপুরুষ ও চট্টগ্রামের অধিবাসি ছিলেন। 

এই চট্টগ্রামে জন্ম নিয়েছেন কিংবা তার কার্যকাল অতিবাহিত করেছেন অনেক বিখ্যাত মনিষি। হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ অবদান রেখেছেন সাহিত্য,সংস্কৃতি,অর্থনিতি ও রাজনিতিতে। কবি নবীনচন্দ্র সেন থেকে ডঃ জামাল নজরুল ইসলাম পর্যন্ত মানুষেরা এই চট্টগ্রামের অধিবাসি ছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই চট্টগ্রামের অনেক বিখ্যাত মুসলিম মনিষির জিবন সম্পর্কে আমরা অনেকেই অজ্ঞ। বৃটিশ বিরোধি সংগ্রাম থেকে শুরু করে অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে মুসলিম মনিষিদের অবদান কে সুকেীশলে আড়াল করে রাখা হয়েছিল অনেকদিন। যারা এই কাজ করেছেন তারা ছিলেন সংকির্ন সাম্প্রদায়িকতায় আক্রান্ত। এখনও চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানের নামকরন দেখলে মনে হবে এই এলাকা যেন মুসলিম সংখ্যালঘিষ্ট। অথচ সত্য হচ্ছে বৃটিশ ভারতের যে অল্প কয়েকটি বড় শহরে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা ছিল তার মধ্যে চট্টগ্রাম প্রধান। চট্টগ্রামের এই ভুলে যাওয়া মনিষিদের সম্পর্কে মানুষকে জানানর জন্য এক অতি পরিশ্রম সাধ্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিশিষ্ট ব্লগার ও লেখক রায়হান আযাদ এবং গবেষনা সংস্থা "সেন্টার ফর রিসার্চ এন্ড পলিসি ষ্টাডিজ" এর উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছে এবং হচ্ছে চট্টগ্রামের একশত মুসলিম মনিষা নামে চার খন্ডে একটি গ্রন্থ। এই গ্রন্থে বৃটিশ আমল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত চট্টগ্রামের একশত জন মুসলিম মনিষির সংক্ষিপ্ত জিবনি সংকলন করা হয়েছে। বইটির লেখক রায়হান আযাদ ভাই অত্যন্ত পরিশ্রম সাধ্য এই জরুরি কাজটি সম্পাদন করেছেন। চার খন্ডের বইটির মধ্যে তিন খন্ড ইতঃমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। লেখক রায়হান আযাদ ভাই দির্ঘদিন সাংবাদিকতা ও গবেষনার কাজে নিয়োজিত আছেন। তিনি বাংলা সাহিত্য এবং ইসলামি স্টাডিজে উচ্চতর ডিগ্রির অধিকারি। ইতঃপূর্বে তিনি চট্টগ্রামের বিখ্যাত মসজিদগুলির বিষয়েও দুই খন্ডে একটি গ্রন্থ লিখেছেন। এই গ্রন্থটির জন্যও তিনি অনেক পরিশ্রম করেছেন। 

একটা প্রশ্ন উঠতে পারে শুধু মুসলিম মনিষিদের নিয়ে এই বই কেন। এই প্রশ্নের জবাব শুরুতেই দেওয়া হয়েছে যে মুসলিম মনিষিদের অবদান কোন হীন উদ্দেশ্যে এতদিন গোপন রাখার চেষ্টা হয়েছে। চট্টগ্রামের অন্য ধর্মাবলম্বি মনিষিদের জিবন নিয়ে অনেক বই পাওয়া যায়। সেখানে মুসলিম মনিষিদের এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে কিংবা তাদের অবদান কে বিকৃত করা হয়েছে। অনেক সচেতন মুসলিম তরুনকেও দেখেছি বৃটিশ বিরোধি আন্দোলন এর অগ্র সেনাপতি সুফী নুর মুহাম্মদ নিজামপুরি কিংবা ভাষা আন্দোলন এর স্থপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম সম্পর্কে অজ্ঞ। এই বইটির উদ্দেশ্য তাদের অবদান সম্পর্কে সকলকে সচেতন করা। চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যাবসায়িরা যে একসময় জাহাজ ব্যবসায় এবং জাহাজ নির্মান শিল্পের পাইওনিয়ার ছিলেন এবং এই দেশের অর্থনিতিতে তাদের বিরাট অবদান আছে সেটাও এখন আমরা প্রায় ভুলে গেছি। এই বইটি আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসকে পুনঃউদ্ধার করেছে।

আমি সবাইকে এই বইটি পড়তে এবং বাংলাদেশের সব অঞ্চলের ভুলে যাওয়া মনিষিদের জিবন ইতিহাস মনে করিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার আহব্বান জানাই।

তিন খন্ডে প্রকাশিত বইটির প্রত্যেকটি খন্ডের মুল্য ১৫০ টাকা। 

প্রাপ্তিস্থান,এবিসি পাবলিকেশন্স ৪৩,শাহি জামে মসজিদ মার্কেট আন্দরকিল্লা চট্টগ্রাম।

প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন। ০১৮১৮৫৯৫৮৯৪ এই নম্বরে।

যাদের জিবনি এই বইটিতে আলোচিত হয়েছে

১ম খন্ড

১. ছুফি নূর মোহাম্মদ নিজামপুরী রহ, (বালাকোটের গাজি,বৃটিশ বিরোধি সংগ্রাম এর বীর যোদ্ধা)।

২. মাওলানা আবদুল হাকীম (দক্ষিন চট্টগ্রামে ইসলামি শিক্ষা প্রসারের অগ্রদূত)।

৩. মাওলানা শাহ আবুল হাসান (ইসলামি চিন্তাবিদ ও শিক্ষাবিদ)।

৪. খান বাহাদুর মেীলভি নাছির উদ্দিন খান (চিন্তাবিদ ও প্রশাসক)।

৫. খান বাহাদুর মেীলভি হামিদুল্লাহ খান ( ঐতিহাসিক এবং প্রশাসক)।

৬. ছুফি ফতেহ আলি ওয়াইসি (বুজর্গ এবং কবি)।

৭. কবি বেগম রহিমুন্নেসা (বাংলা সাহিত্যেও প্রথম মহিলা কবি)।

৮. শেখ ই চাটগাম কাজেম আলি মাষ্টার ( রাজনিতিবিদ ও শিক্ষাবিদ)।

৯. মাওলানা ওবায়দুল হক। (ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অগ্রদূত)।

১০. শাহ মোহাম্মদ বদিউল আলম (সাহিত্যিক ও সাংবাদিক)।

১১. মাওলানা আবদুল কাদের ( শিক্ষাবিদ)।

১২. খান বাহাদুর মাওলানা গোলাম কাদের চেীধুরি (রাজনিতিবিদ ও সমাজসেবক)।

১৩. মাওলানা শাহ হাবিবুল্লাহ রহ. (হাটহাজারি মাদ্রাসার প্রধান প্রতিষ্ঠাতা।

১৪. আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ (সাহিত্যিক এবং গবেষক)।

১৫. আবদুল বারী চেীধুরি (ব্যবসায়ি ও সমাজসেবক)

১৬. খান বাহাদুর আবদুল হক দোভাষ ( ব্যাবসায়ি এবং রাজনিতিবিদ)।

১৭. মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদি (মুসলিম সাংবাদিকতার অগ্রপথিক)।

১৮. আল্লামা শাহ জমিরুদ্দিন রহ. ( পটিয়া মাদ্রাসার প্রধান প্রতিষ্ঠাতা)।

১৯. খান বাহাদুর আবদুস সাত্তার (রাজনিতিবিদ)।

২০. ফখরে বাংলা মাওলানা আবদুল হামিদ (আলিম ও বৃটিশ বিরোধি সংগ্রাম এর অগ্রসৈনিক)।

২১. শায়খুল হাদিস মাওলানা সায়ীদ আহমদ সন্দীপী রহ. (শিক্ষাবিদ)।

২২. মাওলানা শাহ আহমদ হাসান। (শিক্ষাবিদ জিরি মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা)।

২৩. মাওলানা ওলি আহমদ নিজামপুরি। (আলিম ,গবেষক ও শিক্ষাবিদ)।

২৪. শায়খুল হাদিস আল্লামা ফজলুর রহমান (হাদিস গবেষক ও শিক্ষাবিদ)।

২৫. খান বাহাদুর বদি আহমদ চেীধুরি (রাজনিতিবিদ,সমাজসেবক)।

২য় খন্ড

২৬. শায়খুল হাদিস শাহ আবদুল ওয়াদুদ ( ইসলামি চিন্তাবিদ)।

২৭. ডঃ আতাউল হাকিম (গবেষক ও অধ্যাপক)।

২৮. মেীলভি নূর আহমদ চেয়ারম্যান (রাজনিতিবিদ চট্টগ্রাম পেীরসভার দির্ঘ ৩০ বছর এর নির্বাচিত চেয়ারম্যান)।

২৯. আল্লামা শাহ নজির আহমদ।

৩০. এডভোকেট নুরুল হক চেীধুরি।

৩১. মুফতি ফয়জুল্লাহ ( ইসলামি চিন্তাবিদ)।

৩২. মাওলানা শহ আবদুল মজীদ ( গারাঙ্গিয়ার পির সাহেব)।

৩৩. আবদুর রশিদ ছিদ্দিকি (সাংবাদিক)।

৩৪. খান বাহাদুর মাওলানা জিয়াউল হক।

৩৫. আল্লামা ফজলুল্লাহ (ইসলামি গবেষক ও চিন্তাবিদ)।

৩৬. আবদুল খালেক (বাংলার প্রথম মুসলিম ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, প্রকাশক ও সাংবাদিক)।

৩৭. শেখ রফিউদ্দিন আহমদ ছিদ্দিকি (রাজনিতিবিদ, সমাজ সেবক)।

৩৮. মাহবুবুল আলম (সাহিত্যিক,সাংবাদিক ,প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক)।

৩৯. জাকির হোসেন ( আইজি পুলিশ,পূর্ব পাকিস্তান এর গভর্নর)।

৪০. মুফতি মোহাম্মদ আমিন ।

৪১. ডা জাকির হোসেন (হোমিও চিকিৎসার অগ্রদূত)।

৪২. মাওলানা শাহ রফিকুর রহমান (ইসলামি চিন্তাবিদ)।

৪৩. মাওলানা শাহ ইলাহি বক্স।

৪৪.আবদুর রহমান (শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক)।

৪৫. ড. এনামুল হক ( উপাচার্য,সাহিত্যিক,শিক্ষাবিদ)।

৪৬.মাওলানা ছিদ্দিক আহমদ (বিশিষ্ট আলিম এবং পার্লামেন্ট সদস্য)।

৪৭.মাওলানা ওবায়দুল হক (শিক্ষাবিদ গবেষক)।

৪৮.মুফতি আযিযুল হক (শিক্ষাবিদ)।

৪৯. মাওলানা হাফেজ আহমদ ( পির এবং সমাজ সংস্কারক)।

৫০. মাওলানা শাহ মুহাম্মদ হারুন বাবুনগরি।

৩য় খন্ড

৫১. মাওলানা সৈয়দ আবদুল আহাদ আল মাদানি ( শাহি জামে মসজিদ চট্টগ্রাম এর খতিব ও বিশিস্ট চিন্তাবিদ)।

৫২. মাওলানা শাহ আবদুর রশিদ সিদ্দিকি।

৫৩.ব্যারিস্টার মাওলানা ড. সানাউল্লাহ (শিক্ষাবিদ আইনজিবি ও রাজনিতিবিদ)।

৫৪. একে খান (বাংলাদেশের শিল্পায়ন এর অগ্রদুত)।

৫৫. মাওলানা শাহ মুহাম্মদ ইউনুস ।

৫৬.মাওলানা কাজী ওবায়দুর রহমান (সাহিত্যিক ,রাজনিতিবিদ)।

৫৭. মাওলানা আবুল মোজাফফর (শিক্ষবিদ)।

৫৮. শাহ মাওলানা মীর মোহাম্মদ আখতার (বায়তুশ শরফ এর প্রতিষ্ঠাতা)।

৫৯. শাহ মাওলানা আলী আহমদ বোয়ালভি।

৬০. শাহ আবদুল মালেক আল কুতুবি ( আলিম ও পির)।

৬১. আবু আহমদ কাওয়াল ( ইসলামি সংঙ্গিত এর অগ্রদূত)।

৬২. মাওলানা মুজহের আহমদ (শিক্ষাবিদ)।

৬৩. আল্লামা আবুল খায়ের (আলিম)।

৬৪. মাওলানা আবু তাহের মুহাম্দ নাযের (আলিম ও শিক্ষাবিদ)।

৬৫. বাদশাহ মিঞা চেীধুরি (বিশিষ্ট ব্যবসায়ি ও সমাজসেবক)।

৬৬. অধ্যাপক সুলতানুল আলম চেীধুরি (গবেষক ও শিক্ষাবিদ)।

৬৭. হাকিম মাওলানা ইসমাইল হিলালি ( হাকিম ও শিক্ষাবিদ ও কবি)।

৬৮. মাওলানা ওবায়দুল আকবর।

৬৯. একেএম ফজলুল কাদের চেীধুরি (বিশিষ্ট রাজনিতিবিদ পাকিস্তান এর অস্থায়ি প্রেসিডেন্ট)।

৭০. অধ্যক্ষ আবুল কাসেম (ভাষা আন্দোলন এর স্থপতি)।

৭১. মাওলানা মতিউর রহমান নিযামী (বিশিষ্ট আলিম)।

৭২. ইউসুফ চেীধুরি ( ব্যাবসায়ি এবং সাংবাদিক)।

৭৩. আবদুল হক চেীধুরি (গবেষক)।

৭৪. শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মদ আমিন (হাদিস বিশারদ)।

৭৫. রফিকুল্লাহ চেীধুরি (ভাষা সৈনিক ও রাজনিতিবিদ)।

৪র্থ খন্ড(প্রকাশিতব্য)

৭৬.এডভোকেট মৌলভী ফরিদ আহমদ (রাজনীতিবিদ) 

৭৭. ব্যারিস্টার সুলতান আহমদ চৌধুরী 

৭৮. এ এ রেজাউল করিম চৌধুরী (শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক)।

৭৯. শায়খুল হাদিস নেছারুল হক 

৮০. বিচারপতি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী ( বিচারপতি, আইন সচিব)

৮১.এডভোকেট বদিউল আলম (রাজনিতিবিদ)।

৮২. প্রফেসর ড. আবদুল করিম ( ইতিহাসবিদ, চবি উপাচার্য)। 

৮৩. প্রফেসর ডা. নুরুল ইসলাম (জাতিয় অধ্যাপক, চিকিৎসক)। 

৮৪. মোয়াহেদুল মাওলা প্রকাশ জামসেদ উকিল এমপিএ ।

৮৫. শায়খুল হাদীস মাওলানা কবির আহমদ ।

৮৬. মাওলানা ছিদ্দিক আহমদ আযাদ ।

৮৭. শায়খুল হাদীস মাওলানা কামাল উদ্দীন। 

৮৮. মাওলানা মুহাম্মদ শামসুদ্দীন (শিক্ষাবিদ,সমাজসেবক)।

৮৯. প্রফেসর ড. আবদুল গফুর ।

৯০. উপাধ্যক্ষ মাওলানা ছলিমুর রহমান ক্বমরী 

৯১. পীরে বায়তুশ শরফ শাহ মাওলানা আবদুল জাব্বার 

৯২. অধ্যাপক শামসুদ্দন মোহাম্মদ ইসহাক

৯৩. এডভোকেট আবু মোহাম্মদ য়্যাহয়া 

৯৪. ইঞ্জিনিয়ার মনওয়ার আহমদ 

৯৫. মাওলানা মুহাম্মদ হারুন ইসলামাবাদী 

৯৬. সাংবাদিক নজীর আহমদ 

৯৭. আলহাজ্ব রফীক আহমদ চৌধুরী 

৯৮. অধ্যক্ষ মাওলানা মুছলেহ উদ্দীন 

৯৯. প্রফেসর ড. জামাল নজরুল ইসলাম 

১০০. মাওলানা বদিউল আলিম 





চট্টগ্রাম কেন চিটাগং?


প্রজাতির উৎপত্তির যেমন বিজ্ঞানসম্মত কার্যকারণ রয়েছে, তেমনি অন্য অনেক কিছুর মতো কোনো দেশের নামকরণের পেছনেও রয়েছে কার্যকারণলব্ধ উৎপত্তির ইতিহাস। ইতিহাসের ক্রমান্বয়িক ধারায় দেখা গেছে শাসক ও শাসনব্যবস্থা বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে কোনো কোনো অঞ্চলের নামেরও পরিবর্তন হয়েছে। সেই বদল হয়েছে শাসকের ইচ্ছানুযায়ী। আবার শাসনের ক্রমবিবর্তনে সে বদলানো নাম মুছে গিয়ে অঞ্চলটি আবার পরিচিত হয়ে উঠেছে তার পুরোনো কিংবা আদি নামে। জন্মানোর পর শিশুকে যে নাম দেওয়া হয়, সে নাম শিশুটির বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তার অস্থিমজ্জায় রক্ত-মাংসে, ভাবনায় ও চৈতন্যে এমনভাবে মিশে যায় যে সে নিজেকে তা থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। সে নাম তার ভালো কিংবা মন্দ কাজে ব্যাপ্ত বা সংকুচিত হয় বটে, কিন্তু তাতে তার নামের কোনো পরিবর্তন ঘটে না।
ইংরেজিতে চিটাগং না বলে কেন চট্টগ্রাম লেখা হবে না, তা নিয়ে জল গড়িয়েছে অনেক, কিন্তু লেখার সময় এখন লিখছি চিটাগং। কেন চট্টগ্রাম নয়, তা নিয়ে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় বোধ হয় এসেছে। ইস্ট বেঙ্গল ডিসট্রিক্ট গেজেটরসের গেজেটর অব চিটাগং ডিসট্রিক্ট বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০৩ সালে। মূল্যবান তথ্যসংবলিত সেই বইটিতে বিশদ ও সবিস্তারে চট্টগ্রামের ইতিহাস, এখানকার মানুষ, স্বাস্থ্য, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, সেই সময়কার বেতন-ভাতাদি, বাণিজ্যের নানা খুঁটিনাটি, যাতায়াতব্যবস্থা, জমির রাজস্ব পরিচালনা ব্যবস্থা, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, কৃষিকর্ম ইত্যাদি আলোচিত হয়েছে। অর্থাৎ এই গ্রন্থটিকে সেই সময়ের চট্টগ্রামকে বিশদভাবে জানার একটি আকর গ্রন্থ বলা যেতে পারে। এই বইটির লেখক ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের দক্ষ কর্মকর্তা এল এস এস ওম্যালি। যাঁদের কাছে তিনি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন, তাঁরা হলেন স্যার চার্লস অ্যালেন, যিনি ১৯০০ সালে চিটাগং সার্ভে ও সেটেলমেন্ট রিপোর্টটি তৈরি করেছেন এবং সেই সময়কার চট্টগ্রাম বিভাগের কমিশনার এইচ লুসন সাহেব।
‘দ্য অরিজিন অব নেইম’ অর্থাৎ এই অঞ্চলের নামের উৎস খুঁজতে গিয়ে তিনি বেশ কয়েকটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। প্রথমে উদ্ধৃত করেছেন বুদ্ধধর্মাবলম্বীদের ভাষ্য, চৈতকিয়াং কিংবা চৈতাগ্রাম, চৈতার অর্থ হলো বুদ্ধের স্মৃতিসৌধ, সেই থেকে সম্ভবত এই অঞ্চলের নাম চট্টগ্রাম। হিন্দুমতে চট্টগ্রামের আদি নাম ছিল চট্টলা। মুসলমান শাসক অধিগ্রহণের পরে সে নাম পরিবর্তন করে রাখা হলো চাটিগাঁও। মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে অর্থাৎ চাটি জ্বালিয়ে পীর বদর শাহ অশুভ প্রেতাত্মাদের তাড়িয়েছিলেন বলে এই নাম। নবম শতকে আরাকানের এক রাজা এই অঞ্চলে রক্তক্ষয়ী অভিযান চালান। জয় করার পর সেই বিজয়কে চিহ্নিতকরণের উদ্দেশ্যে এই অঞ্চলের কোন একটি জায়গায় একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন। নির্মাণ শেষে রাজা যে মন্তব্যটি করেন, স্মৃতিস্তম্ভ সেই পরিচয়ে পরিচিত হয়ে ওঠে। মন্তব্যটি হলো, ‘তিসত- তা- গুং’ মানে পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া অনুচিত।
একদিন আত্ম-অনুসন্ধানের পথ ধরে চিটাগংকেও হতে হবে চট্টগ্রাম। কারণ, এই নামের সঙ্গে কত কিংবদন্তি, কত গাঁথা– লোককথা–উপকথা মিশে আছে

বিশ্বখ্যাত ইতিহাস ও ভূগোলবিদ ব্যারনুলি তাঁর ডেসক্রিপশন হিস্টোরিক এট জিয়োগ্রাফিক ডি লিন্ডে (১৭৮৬) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন ‘শাট’ মানে বদ্বীপ এবং গঙ্গা, এই দুয়ের সংযুক্তির ফলে এই জায়গার নামকরণ হয়েছে শাটগঙ্গা, যার মানে গঙ্গার সম্মুখে গড়ে ওঠা নগরী। স্যার উইলিয়াম জোন্স অনুমান করেছেন যে এই জায়গায় একটি অনন্যসুন্দর পাখি দেখা যেত; একটি দুটি নয়, ঝাঁকে ঝাঁকে দেখা যেত। পাখিটির নাম ‘ছাতগ’। সেই থেকে বোধ করি চাটিগাঁ। সংস্কৃত পণ্ডিতেরা আবার অন্য ভাষ্য দিয়েছেন, বলেছেন চতুগ্রাম থেকে কালিকপ্রবাহ ও বিবর্তনে এর নাম হয়েছে চট্টগ্রাম। তবে তার সবিস্তার কোনো ব্যাখ্যা নেই।
অনুমান করতে অসুবিধা হয় না যে প্রতিটি দেশের প্রতিটি অঞ্চলের নামের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস, জনশ্রুতি, নানা কথা, উপকথা ও কিংবদন্তি। সেন্ট পিটার্সবুর্গকে কমিউনিস্ট রাশিয়া নতুন নাম দিলেন লেনিনগ্রাদ। যেই বয়ে গেল পরিবর্তনের হাওয়া সেন্ট পিটার্সবুর্গবাসীরা আদি নামটি ফিরিয়ে দেওয়ার জোর দাবি তুলল। লেনিনগ্রাদ মুছে সেই প্রাচীন নগর আবার হয়ে গেল সেন্ট পিটার্সবুর্গ। কারণ, এই নামের পেছনে আছে এক দীর্ঘ ইতিহাস, আছে তার নৃতাত্ত্বিক ভিত্তি, আছে ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীর সম্পৃক্তি।
চিটাগং গ্যাজেটিয়ারে লেখক এ-ও উল্লেখ করেছেন যে ইংরেজ শাসকদের অনেক বদভ্যাসের মধ্যে একটি ছিল ‘ভালগারাইজেশন অব নেমস’ নামের বিকৃতি করা। এটা যে আমরা উপলব্ধি করিনি, তা কিন্তু নয়। ঢাকা এখন সারা পৃথিবীতে ঢাকা নামে পরিচিত, ড্যাক্কা (DACCA) নয়। বার্মা হয়ে গেছে মিয়ানমার, পিকিং বেইজিং, রেঙ্গুন ইয়াঙ্গুন, বম্বে মুম্বাই, ক্যালকাটা কলকাতা, তাহলে চিটাগং কেন চট্টগ্রাম নয়। একদিন আত্ম-অনুসন্ধানের পথ ধরে চিটাগংকেও হতে হবে চট্টগ্রাম। কারণ, এই নামের সঙ্গে কত কিংবদন্তি, কত গাঁথা–লোককথা–উপকথা মিশে আছে, কত সুখ-দুঃখের, যুদ্ধ-বিগ্রহের, বীরত্ব ও রক্তক্ষয়ের, ঝড়-তুফান ও প্লাবনের স্মৃতি আছে জড়িয়ে।
সুফি সাধকের পীর আউলিয়ার এই পুণ্যভূমির নাম চট্টগ্রামই থাকুক, এ দেশে যেমন, ভিনদেশের মানুষও ডাকুক এই নামে। তাঁরা জানুক এই প্রাচীনতম বন্দরনগর, যা ইবনে বাতুতাকে মুগ্ধ করেছিল ১৩৫০ সালে, যা আইন-ই-আকবরিতে উল্লিখিত আছে সমুদ্রপাশে সুন্দরতম নগরী বলে তার নাম চট্টগ্রাম। কেন অহেতুক চিটাগং হবে। সেই কবে আমাদের রক্ত-মাংস চিবিয়ে আমাদের ঝাঁঝরা করে দিয়ে
সব লুটেপুটে চলে গেছে ইংরেজ আর আমরা এখনো সেই নাম বহন করে চলেছি। এটা ভীষণ লজ্জার। ’৪৭-এ ভারত-পাকিস্তান, ’৭১-এ বাংলাদেশ, তবু ঔপনিবেশিক ভূতকে তাড়ানো গেল না। আসুন, সবাই মিলে আওয়াজ তুলি, চিটাগং নয়, এই সুন্দরতম অঞ্চলের নাম ‘চট্টগ্রাম’, বিশ্বের সবাই যেন সেই নামে চেনে, সেই নামে ডাকে...।

শান্তনু বিশ্বাস: সংগীত শিল্পী, সংস্কৃতি কর্মী।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস ও পরিচিতি

(এক)
তবুও শান্তি হোক পাহাড়ের
কবিতা চাকমা
“জ্বলি ন উধিম কিত্তে ই!
[রুখে দাঁড়াবো না কেন!]
যিয়ান পরানে কয় সিয়েন গরিবে-
[যা ইচ্ছে তাই করবে]
বষততান বানের বিরানভূমি
[বসত বিরান ভূমি]
ঝাড়ান বানেবে মরুভূমি,
[নিবিড় অরণ্য মরুভূমি]
অবহেলা অপমানে ক্রোধ
[অবহেলা অপমানে ক্রোধ]
ভিদিরে তুবোল লোর স্রোত
[ধমনীতে তুমুল রক্তের স্রোত]
পাথ্থর খুনি খুনি ভাঙে বিঘ্ন,
[আঘাতে আঘাতে ভাঙে বিঘ্ন]
চেতনার সাগরত রণ তীক্ষ্ম।
[চেতনার সমুদ্র তারুণ্যে তীক্ষ্ম]
-মর পরিপূরক গায় মুই-ই
[-আমার সম্পূরক একমাত্র আমিই]
জ্বলি ন উধিম কিত্তেই!
[রুখে দাঁড়াবো না কেন!]”
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে পার্বত্য চট্টগ্রাম অবস্থিত। উত্তরে ও খাগড়াছড়ি জেলার পশ্চিমে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, পূর্বে ভারতের মিজোরামের লুসাই পাহাড়পুঞ্জ ও মায়ানমার, দক্ষিণে মায়ানমার, পশ্চিমে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা।
 বাংলাদেশের প্রধান পার্বত্যাঞ্চল, সমতলভূমির থেকে এর রূপ সম্পূর্ণ ভিন্ন। পাহাড়পুঞ্জের মধ্যস্থলে রয়েছে উপত্যকা, যা অনেকটা সমতল; বনভূমিময় এবং রয়েছে ঝরনাধারা, যেগুলোকে বলা হয় ‘ছড়া’ বা ‘ছড়ি।’
আয়তন নিশ্চিতভাবে সম্ভব কেউ জানে না; একমতে, ৫০৯৩ বর্গমাইল, আরেক মতে, ৫১৩৮ বর্গমাইল বা ১৩০০০ বর্গ কিঃমিঃ; মোটামুটিভাবে বাংলাদেশের দশ ভাগের এক ভাগ।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়পুঞ্জ উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত। এগুলোকে দশটি ভাগে বিন্যাস্ত করা যায়: সুবলং, মায়ানি, কাসালং, সাজেক, হরিং, বরকল, রাইনখিয়াং, চিম্বুক, মিরিঞ্জা। পাহাড়গুলো সাধারণত ১০০ থেকে ৩০০০ ফুট উঁচু; সবচেয়ে উঁচু চুড়া কেওক্রাডং (২৯৬০ফুট)। সম্প্রতি কিছু তরুণ দাবী করে থাকেন এর চেয়ে উচ্চ কিছু পাহাড়ের অবস্থান তারা নির্ণয় করতে পেরেছেন।
পার্বত্য এলাকায় অভিবাসনের ইতিহাস বেশ পুরনো। সপ্তদশ শতক থেকে পার্বত্য এলাকায় অভিবাসন প্রক্রিয়া চলছে। ১৪১৮ খ্রীস্টাব্দে পার্বত্য চট্টগ্রামের মূল অধিবাসী কুকিরা; আরাকানী চাকমাদের আগ্রাসনে চাকমা রাজা মওয়ানৎসুনিপ আপার বার্মা অঞ্চল থেকে বিতাড়িত হন এবং কক্সবাজারের রামু এবং টেকনাফ এলাকায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। ব্রহ্মযুদ্ধের সময় মগরা আরাকান থেকে বিতাড়িত করে চাকমাদের, তারা দলে দলে ঢোকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ও বসতি স্থাপন করে। জাতি হিসেবে তারা বিন্যস্ত হয় তিনভাগে; চাকমা, মারমা (মগ), তঞ্চগ্যানা আরাকানি; ত্রিপুরা (টিপরা), রিয়াং, ম্রোংরা ত্রিপুরী, পাংখু, বন, চক, খুমিয়া, ম্রোং, খিয়াংরা কুকি।
১৭৭৭ খ্রীস্টাব্দে রোনা খান-এর নেতৃত্বে কুকিরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে এক ব্যর্থ বিদ্রোহ সংঘটিত করে। পরবর্তী কিছুকাল বিচ্ছিন্নভাবে এ ধরনের বিদ্রোহাত্মক কাজ চলতে থাকে।
১৮৬০ খ্রীস্টাব্দে পার্বত্য এলাকাকে চট্টগ্রাম জেলা থেকে আলাদা করে একজন তত্ত্বাবধায়কের নেতৃত্বে স্বতন্ত্র জেলার মর্যাদা দেয়া হয়।
১৯০০ খ্রীস্টাব্দে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিধি- ১৯০০ পাশ করা হয় এবং পার্বত্য এলাকাকে ‘স্বায়ত্তশাসিত’ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
১৯২০ খ্রীস্টাব্দে পার্বত্য চট্টগ্রাম গভর্নর জেনারেলের বিশেষ তত্ত্বাবধানের আওতায় বিশেষ অঞ্চল হিসেবে ঘোষিত হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান নদী সাতটি- চেঙ্গী, মায়ানি, কাসালং, কর্ণফুলি, রাইনখিয়াং, সাংগু, মাতামুহুরি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান হ্রদ কাপ্তাই; এটি একটি কৃত্রিম হ্রদ, যার আয়তন ২৬৫ বর্গমাইল। জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্যে কর্ণফুলি নদীতে বাঁধ (দৈর্ঘ্য ১৮০০ ফুট, উচ্চতা ১৫৩ ফুট) দেয়ার ফলে এটি সৃষ্টি হয়। এ হ্রদের জলে ডুবে যায় পুরনো রাঙ্গামাটি। নির্মিত হয় নতুন রাঙ্গামাটি শহর। এছাড়া আছে দু’টি প্রাকৃতিক হ্রদ- রাইনকিয়ানকাইন ও বোগাকাইন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা তিনটি: খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান। পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় থানা আছে ২৫টি। খাগড়াছড়িতে ৮টি: খাগড়াছড়ি, পানছড়ি, দিঘিনালা, মাটিরাঙ্গা, রামগড়, মানিকছড়ি, মহালছড়ি ও লক্ষ্মীছড়ি। সম্প্রতি গুইমারা নামে একটি নতুন থানা সৃষ্টির কাজ এগিয়ে চলছে।
রাঙ্গামাটিতে ১০টি: রাঙ্গামাটি, বাঘাইছড়ি, লংগুদু, বরকল, নানিয়রচর, কাউখালি, জুরাইছড়ি, কাপ্তাই, রাজস্থলি ও বিলাইছড়ি।
বান্দরবানে ৭টি: বান্দরবান, রোয়াংছড়ি, রুমা, লামা, থানচি, আলিকদম ও নাইক্ষংছড়ি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ১৩টি উপজাতির বসবাস। এরা হলো- চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, মুরং, তঞ্চগ্যা, বৌম, পাংখু, খুমি, লুসাই, খিয়াং, চাক, কুকি ও সাঁওতাল।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে জুম পদ্ধতিতে ও উপত্যকায় প্রচলিত কৃষিজ পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হয়। তবে জুমই চাষের প্রধান পদ্ধতি। পাহাড় পুড়িয়ে তগল বা দা দিয়ে গর্ত খুঁড়ে একই গর্তে বোনা হয়, ধান, কার্পাস, ভুট্টা, শসা প্রভৃতির বীজ। সমতলভূমিতে উৎপাদন করা হয় ধান, সরষে, তামাক, মরিচ, বেগুন প্রভৃতি।
চাকমা, তঞ্চগ্যা ও মারমারা বৌদ্ধ, ত্রিপুরারা হিন্দু, লুসাইরা খ্রিস্টান; ম্রো, রিয়াং, খুমি, ম্রোং, বনজোগী, পাংখোলা সর্বাত্মবাদী। তবে এরাও বর্তমানে খ্রিস্টান হয়েছে ব্যাপকভাবে।
এখানকার প্রত্যেক উপজাতির রয়েছে নিজস্ব ভাষা; নিজেদের মধ্যে তারা নিজেদের ভাষায় কথা বলেন; তবে ভিন্ন উপজাতির সাথে কথা বলেন বাংলায়। চাকমা, ত্রিপুরা ও মগদের প্রধান বার্ষিক উৎসব বৈসাবি  মেলা অনুষ্ঠিত হয় বাংলা বর্ষের শেষে। পুরুষরা ধূতি ও জামা পড়ে, মাথায় পরে ‘খরং’, নারীরা নিম্নাঙ্গে পরে ‘পিন্দম’, বক্ষে ‘খাদি’, তারা শাড়ি-ব্লাউজও পরে। নারীরা উৎকৃষ্ট বুননশিল্পী; তারা বুকে কারুকাজখচিত বস্ত্র, যার নাম ‘আলম।’ বাঁশের বাঁশি তাদের প্রধান বাদ্যযন্ত্র, যাতে তারা তোলে প্রেমাবেগের আকুলতা। তাদের প্রিয় ও প্রধান মহাকাব্যের বিষয় রাধামোহন ও ধনপতির বিরহবিধুর প্রেম।
ব্রিটিশ সরকার ১৯০০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামকে তিনটি সার্কেলে ভাগ করে। এদের মধ্যে বান্দরবান জেলা ও রাঙ্গামাটির কিছু অংশ নিয়ে বোমাং সার্কেল, খাগড়াছড়ি জেলাকে নিয়ে মং সার্কেল এবং রাঙ্গামাটির বেশিরভাগ এলাকা নিয়ে চাকমা সার্কেল গঠিত হয়। সার্কেল পরিচালনার জন্য একজন করে চিফ করা হয়। তাদের নাম দেয়া হয় সার্কেল চিফ। সার্কেল চিফরা নিজ সম্প্রদায়ের কাছে রাজা হিসাবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন।
রাজপূণ্যাহ অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য হচ্ছে, পার্বত্য এলাকার জুমচাষীদের সারা বছরের কাজকর্ম সেরে কিছু সময় রাজা দর্শন, বিনোদন এবং রাজকর প্রদান করা। প্রতিবছর জুম চাষের সব ফসল ঘরে তুলে ডিসেম্বর বা জানুয়ারির সুবিধামত সময়ে বান্দরবন পার্বত্য জেলায় বোমাং সার্কেলের রাজপুণ্যাহ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। ১০৯টি মৌজা নিয়ে বোমাং সার্কেল গঠিত। একে বোমাং থংও বলা হয়ে থাকে। এর আয়তন ১ হাজার ৭০২ বর্গমাইল।
প্রায় তিনশ বছর আগে থেকে রাজকর আদায় অনুষ্ঠান হচ্ছে বলে বোমাং রাজপরিবার সূত্র জানালেও ১৯০০ সাল থেকে পার্বত্য শাসন বিধি চালু হওয়ার পরই রাজপূণ্যাহর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় বলে বিভিন্ন ইতিহাসে পাওয় যায়। রাজার অধীনে থাকে কারবারী, রোয়াজা ও ফাইংসিগন। প্রতি বছর বোমাং সার্কেলের রাজার আয়োজনে জাঁকজমকের সঙ্গে বান্দরবান রাজার মাঠে রাজপূণ্যাহ অনুষ্ঠিত হয়। পাঁচ থেকে সাত দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানে পার্বত্য জেলার উপজাতি, বাঙ্গালি, পার্শ্ববর্তী চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার লোকজন এবং বিদেশি পর্যটকরা ছুটে আসেন এই অনুষ্ঠান দেখতে। লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় রাজবাড়ি, রাজার মাঠ তথা বান্দরবান জেলা শহর।
রাজপুণ্যাহ মেলা পরিণত হয় গ্রাম্য লোকজ মেলায়। বোমাং তং-এর লোকজন নিয়ে বাড়ি ছেড়ে ছুটে আসে রাজদর্শনে। ইচ্ছে শুধু রাজাকে এক নজর দেখা ও আশীর্বাদ নেয়া এবং উপঢৌকন দেয়া।
বিউগলের সুর, পটকার আওয়াজ এবং তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে পুণ্যাহর প্রস্তুতি শুরু হয়। বোমার রাজা রাজকীয় পোষাক পরিধান করে রাজপ্রাসাদ থেকে ধীরে ধীরে রাজ দরবারের দিকে এগিয়ে আসেন। আসার সময় সামনে-পেছনে থাকে তলোয়ার, বন্দুক, বল্লমধারী সৈন্য সামন্ত, পাইক-পেয়াদা। আরো থাকে উজির-নাজির, দগইং, চগইং, জমাদার, হেডম্যান, কারবারী এবং আমন্ত্রিত অতিথি। লালগালিচা বিছানো পথ দিয়ে রাজা এগিয়ে যান রাজ দরবারের দিকে। উপজাতি তরুণ-তরুণীরা রাজাকে ফুলের পাঁপড়ি ছিটিয়ে অভ্যর্থনা জানায়। প্রজারা দাঁড়িয়ে সম্মান জানায়। আরেকদল ম্রো, যুবক-যুবতী প্রু হাতে নিজেদের পোষাক পরিধান করে রাজার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে। রাজা বাহাদুর রাজ পোশাকে সজ্জিত হয়ে কোমরে সোনার তলোয়ার নিয়ে রাজ দরবারের সিংহখচিত রাজ আসনে গিয়ে বসেন। রাজার দুপাশে আমন্ত্রিত অতিথিরা বসেন। সবার দৃষ্টি থাকে রাজার দিকে। এ সময় রাজ দরবারে মানুষের ঢল নামে। প্রজাদের অন্তিম প্রার্থনা থাকে- দেবতুল্য রাজা যেন দীর্ঘজীবী হোন।
বোমাং রাজবংশ মিয়ানমারের আরাকান পেগু রাজবংশের উত্তরসূরি। কালের পরিক্রমায় ১৮২২ সালে বিভিন্ন কারণে তারা বান্দরবানে বসতি স্থাপন করেন। তৎকালীন রাজা ছিলেন সাক থাই প্রু বামাংগ্রী। তখন থেকে এ পর্যন্ত বংশানুক্রমিকভাবে এই রাজপ্রথা চালু রয়েছে। এক নজরে বোমাং রাজবংশের সদস্যগণ-
১.    মং চ পাই বোমাং ১৬১৪-১৬৩০ খ্রিষ্টাব্দ।
২.    মং গ্রই প্র“ বোমাং ১৬৩০-১৬৬৫ খ্রিষ্টাব্দ।
৩.    হেরি প্র“ বোমাং ১৬৬৫-১৬৮৭ খ্রিষ্টাব্দ।
৪.    হেরি ঞো বোমাংগ্রী ১৬৮৭-১৭২৭ খ্রিষ্টাব্দ।
৫.    কং হা প্র“ বোমাংগ্রী ১৭২৭-১৮১১ খ্রিষ্টাব্দ।
৬.   সাক থাই প্র“ বোমাংগ্রী ১৮১১-১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দ।
৭.   কং হা ঞো বোমাংগ্রী ১৮৪০-১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দ।
০৮.   মং প্রু বোমাংগ্রী ১৮৬৬-১৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দ।
০৯.    সাক হ্নাই ঞো বোমাংগ্রী ১৮৭৫-১৯০১ খ্রিষ্টাব্দ।
১০.    চ হা প্রু বোমাংগ্রী ১৯০১-১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দ।
১১.    মং সা ঞো বোমাংগ্রী ১৯১৬-১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দ।
১২.    ক্যা জাই প্রু বোমাংগ্রী ১৯২৩-১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দ।
১৩.    ক্যা জ সাই বোমাংগ্রী ১৯৩৩-১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দ।
১৪.    মং শোয়ে প্রু বোমাংগ্রী ১৯৫৯-১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দ।
১৫.    বোমাংগ্রী অং শৈ প্রু চৌধুরী ১৯৯৭- ৮-৮২০১২।  
১৬. ক্য সাইন প্রু ২০-১১-২০১২ –  ৬-২-২০১৩।
১৭. উ চ্য প্রু ৪-৪- ২০১৩ থেকে চলমান
রাজপূণ্যাহতে প্রজারা রাজকর দিয়ে থাকেন। প্রথম শ্রেণীর ভূমির জন্য একরপ্রতি তিন টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণীর জন্য দুই টাকা এবং তৃতীয় শ্রেণীর জন্য এক টাকা হারে রাজকর দেয়া হয়। এছাড়া জুম চাষীরা পরিবার প্রতি ছয় টাকা হারে কর এবং ঐতিহ্যবাহী অইং (প্রথাগত) নজরানা রাজাকে দিয়ে থাকেন। অইংয়ের মধ্যে রয়েছে এক আরি চাল, একটি মোরগ, এক বোতল মদ, এক বোতল চিংরে এবং এক হাঁড়ি স্বাপাইট।
রাজার রাজ্য শাসন পদ্ধতি ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের আগে চালু ছিল। রাজপ্রাসাদ, রাজার জৌলুস, সৈন্য সামন্ত ইত্যাদির তৎকালীন সময়ে চালু থাকলেও ব্রিটিশ শাসনের পর থেকে এ দেশ থেকে তা উঠে যায়। ব্রিটেনের রাজা-রানীর মতো ক্ষমতাধর না হলেও প্রতীক হিসেবে হলেও বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলার রাজপ্রথা চালু রয়েছে।
বোমাং অর্থ সেনাপতি, তৎকালীন আরাকানের মোগল অনুগত শাসক মংখমং পর্তুগিজদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য তার শ্যালক মংচ পাই-কে পাঠালে এক সফল অভিযানে পর্তুগিজদের বিতাড়ন করলে তার ভগ্নিপতি কর্তৃক বোমাং উপাধি লাভ করেন।
মাংখমংয়ের মৃত্যুর পর মংচপাই রাজ্যের উত্তরাধিকারী হন। তার মৃত্যুর পর দুই পুত্র চাইন্দা উইজাইয়াহ ও হেরিঞো পেগু রাজ্য পরিচালনা করেন। এ সময় চাইন্দা মোগল সরকারকে কর দিতে অস্বীকার করেন এবং ১৭১০ সালে অভিযান চালিয়ে চট্টগ্রামের কিছু অঞ্চল মোগল সরকার থেকে দখল করে নেন। এ সময় চাইন্দাকে তার ভাই হেরিঞো যুদ্ধে সহায়তা করেন। যুদ্ধে সহায়তার জন্য হেরিঞোকে চাইন্দা রাজা বোমাংগ্রী উপাধিতে ভূষিত করেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান পইংজা পোওয়ে (রাজপুণ্যাহ)। এটি একটি ঐতিহ্যবাহী রাজস্ব আদায়ী উৎসব। তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি উপজাতি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক ভাবগাম্ভীর্যসম্পন্ন এই অনুষ্ঠান সুদীর্ঘকাল ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে কর আদায়ের জন্য মূলত এই অনুষ্ঠান হতো। রাজ্য ও রাজদণ্ডহীন রাজা খাজনা আদায়কাজ ছাড়া সামাজিক বিভেদ মীমাংসা ও ভূমি বিরোধ বিষয়ে রিপোর্ট প্রদান করে থাকেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান বা সমাজপতি তিন রাজা- চাকমা, মং, ও বোমাং রাজা। রাজারা নিজ নিজ সার্কেল বা এলাকার প্রধান, সমাজ শাসনের ও কর আদায়ের দায়িত্ব তাদের। কর আদায়ের জন্য নিযুক্ত হতো দেওয়ানরা, যারা ছিল খুবই শক্তিমান। ১৯০০ সালে দেওয়ান পদটি লুপ্ত হয়। শাসনের জন্য প্রতিটি মৌজার জন্য আছে একজন করে ‘হেডম্যান’, আর পাড়া/গ্রামের জন্য ‘কারবারি।’ তারা অনেকটা পাহাড়ি যাযাবর; হেডম্যান বা কারবারির অনুমতি নিয়ে তারা বিশেষ পাহাড়ে বা ভূমিতে থাকতে ও চাষ করতে পারে। এক অর্থে তারা চিরউদ্বাস্তু। চাকমাদের বিচারপদ্ধতিকে বলা হয় ‘লাজের বাহার।’ প্রতিটি উপজাতি বিভক্ত কয়েকটি গোত্রে; যেমন, ম্রোংদের আছে পাঁচটি গোত্র, মগদের একুশটি, চাকমাদের চব্বিশটি।